alo
ঢাকা, রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঢাকা ব্যাংক গ্রাহকবান্ধব ব্যবসায়িক নীতি অনুসরণ করে

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ০৩:৪৬ পিএম

ঢাকা ব্যাংক গ্রাহকবান্ধব ব্যবসায়িক নীতি অনুসরণ করে
alo

 

নিউজনাউ ডেস্ক: সম্প্রতি ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এমরানুল হক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে অস্থিতিশীল অর্থনীতি, বাংলাদেশের রিজার্ভ, ডলারের মূল্য বৃদ্ধিসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাথে কথা বলেছেন। নিউজনাউয়ের পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো: 

এমরানুল হক: এটি তো আসলে অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা না। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সমগ্র বিশ্বের সবাই এই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছেন, আমরাও এর বাইরে নই। এর প্রভাব আমাদের দেশের ওপরও পড়েছে স্বাভাবিকভাবেই। ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। অনেক জায়গায় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা তহবিলে এ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের চড়া মূল্য গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, আমরা সবাই বর্তমানে একটি ক্রান্তিকালীন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তার পরেও আমি বলব, আমাদের সরকার এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে আমরা আরও বেশি খারাপ অবস্থায় যাওয়া থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি। এর মধ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এমন আরও কিছু পদক্ষেপ রয়েছে; যা কাজে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপগুলো নেওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোও অনেক সচেতন হয়েছে। ব্যাংকগুলোও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমি মনে করি, বছরের বাকি দুটি মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বর হয়তো আমাদের একটু নিয়ন্ত্রিত পরিচালনার মধ্যে থাকতে হবে। এর পরেই আমরা আবার ভালো অবস্থানের দিকে যাওয়া শুরু করব বলে আশা করা যায়। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অল্প অল্প করে ভালোর দিকে যাবে। কমার যে প্রবণতা এটা আর থাকবে না আশা করা যায়। এই দুটি মাস আমাদের সামাল দিতে হবে, যদিও এটি বিশাল এক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

# আমাদের স্থানীয় বাজারে যে একটা বড় ধরনের ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে- এ সম্পর্কে বলুন।

এমরানুল হক: এ ধরনের পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সমস্যা থেকে উত্তরণের সময়টুকুতে সবাইকেই যার যার জায়গা থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ঠিক তেমনিভাবে এখন আমাদের জীবনযাত্রার ধারায় হয়তো কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। এটা করতে হবে দেশের স্বার্থে এবং সবার স্বার্থে। তাহলেই আমি মনে করি বড় রকমের কোনো খারাপ অবস্থা সামনে আর তৈরি হবে না। আমদানি কমে যাচ্ছে, দেশীয় উৎপাদনও কমছে, ফলে কেনাবেচাও কমে যাবে। এতে কিছুটা মন্দাভাব দেখা দেবে। এই মন্দাভাবটা আমাদের মেনে নিতে হবে বৃহত্তর স্বার্থে চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য।

# রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে কোনো আশঙ্কা করেন?

এমরানুল হক: দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হয়। সবাই যদি সবার প্রতি সহনশীল থাকেন এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডে না জড়ান তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে না। বর্তমানে সাধারণ মানুষ অনেক সচেতন। তারা দেশের পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। তাই আমি মনে করি, ওই রকমভাবে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে না যদি সাধারণ মানুষ সহনশীল এবং ধৈর্যশীল থাকেন।

# করোনা মহামারির পর এখন আপনাদের বিনিয়োগ এবং পাওনা ঋণ পরিশোধ কি উন্নতির দিকে?     

এমরানুল হক: আমাদের দেশ কিন্তু দিন দিন উন্নতির মধ্য দিয়ে ধাবিত হচ্ছিল। শিল্পোন্নয়ন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা সামগ্রিকভাবে। ব্যাংকগুলোও করোনা সময়ের পর থেকে আরও সাবধানতার সঙ্গে ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। সামগ্রিক ঋণ আদায়ের চিত্রও উন্নতির দিকেই ছিল। কিন্তু এরই মাঝে এই বৈশ্বিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আবার কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমরা যে যার জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি। নতুন করে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে এবং সময় মতো ঋণ আদায়ের ব্যাপারে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

# সারা দেশে এসএমই লোনগুলোর কেমন অবস্থা চলছে করোনা পরবর্তী সময়ে?

এমরানুল হক: এসএমই ঋণগুলো সাধারণত অভ্যন্তরীণ চাহিদা। ২০২০-২১ সালে অর্থাৎ করোনা মহামারির সময়ে আমাদের দেশে যে ঋণের চাহিদা তা কিন্তু পূরণ করেছে এসএমই খাত। এই চাহিদাগুলো সাধারণত উৎসবকেন্দ্রিক হয়। যেমন- পয়লা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ইত্যাদি। করোনা মহামারির এই দুই বছর সাধারণ মানুষ কিন্তু কোনো উৎসব পালন করতে পারেননি। এ বছর যেহেতু আমরা করোনা থেকে বেরিয়ে এসেছি তাই আমি মনে করি, এ বছর সম্ভাবনার বছর ছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এসএমই খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু এরই মাঝে এই বৈশ্বিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় এসএমই খাত আবার ধীর হয়ে পড়েছে। পুরো বিশ্বে এর প্রভাবে ব্যবসাগুলো কিছুটা মন্থর হয়ে গেছে। যখনই ঘুরে দাঁড়াবার সময় এসেছিল তখনই আবার একটা ধাক্কা এসেছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি আমাদের দেশ এবং অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

# বড় বড় ঋণের ক্ষেত্রে প্রভাব কেমন পড়েছে? এটা কি তারা ঠিকঠাক পরিশোধ করতে পেরেছেন?

এমরানুল হক: করোনার সময়ে বেশ কিছু ব্যবসায়িক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যেমন- পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় অনেক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সেই সঙ্গে হসপিটালিটি সেক্টরও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব খাতের ব্যবসায়ীদের একটু সময় দিতে হবে ঘুরে দাঁড়ানোর। কারণ সবার মতো তাদের অবস্থানটা এক রকম নয়। কিছু কিছু সেক্টরে পেমেন্ট ডিলে হচ্ছে। কিন্তু আশা করা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে আমরা ভালো অবস্থানে পৌঁছে যেতে সক্ষম হব।

# ঋণখেলাপি হওয়ার পেছনে ৬০ ভাগ দায়ী ব্যাংক বলে অনেকে মনে করেন। এ বিষয়ে নানা জটিলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

এমরানুল হক: এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি ব্যাংক এবং কাস্টমারের মধ্যে যদি সুসম্পর্ক থাকে আর ব্যাংকগুলো যদি ঋণ প্রদানের আগে যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ করে তবে এমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। প্রথমত, বুঝতে হবে ব্যবসা থেকে নগদ প্রবাহ আসছে কি না। এর ওপর নির্ভর করেই কিন্তু যে কোনো সমস্যার সমাধান করা উচিত। তবে কিছু কিছু জায়গায় হয়তো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমন যদি কোনো ব্যাপার থাকে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তারল্য নেই- তার পরেও ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে, তাহলে তো সে তা পরিশোধ করতে পারবেন না। এ অবস্থায় তাকে সাহায্য না করে উল্টো তার ওপর চাপ প্রয়োগ করলে সে খেলাপি হবেই। একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি মনে করি, কোনো কাস্টমারের যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে তাকে ব্যবসা করে টাকা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এতে ব্যাংক এবং কাস্টমার উভয়পক্ষই লাভবান হবেন।

# এত সমস্যার পরেও ঢাকা ব্যাংক ভালো করছে- এর  পেছনে কী স্ট্র্যাটেজি কাজ করছে?

এমরানুল হক: একটি ব্যাংক ভালো করবে তখনই যখন তার ব্যালেন্স সিট বৃদ্ধি পাবে। আর এটা তখনই হবে যখন ঋণের চাহিদা থাকবে। ফলস্বরূপ ঋণের পরিমাণ বাড়বে। আবার অর্থনীতিতে তারল্য থাকলে আমানত বাড়বে। অর্থনীতিতে চাহিদা ও জোগান যদি ঠিক থাকে তাহলেই একটা ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হয়। ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। ব্যবসার পরিধি বেড়েছে বলেই ভালো মুনাফা আসছে। ঢাকা ব্যাংক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেই ভালো করছে, অন্যরাও ভালো করছে। যদি তা না হতো তাহলে বর্তমান সংকট ব্যাপক আকারে দেখা দিত। ঢাকা ব্যাংক সব সময়ই গ্রাহকবান্ধব ব্যবসায়িক নীতি অনুসরণ করে এসেছে এবং গ্রাহকদের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে। আর এটিই ঢাকা ব্যাংকের ভালো করার পেছনে মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।

# আপনারা নতুন একটা প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছেন। এতে গ্রাহক কতটা সুবিধা পাবেন?

এমরানুল হক: এটি মূলত যারা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং করতে চান তাদের জন্যই এই প্রোডাক্টটি আমরা চালু করেছি। অনেক জায়গায় দেখা যায়, ইসলামিক শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যবসার গ্রাহক বেশি। তাদের ভালো সেবা নিশ্চিত করার জন্যই আমরা এটি চালু করেছি। এটি পরিপূর্ণ ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা ব্যাংকের প্রথম পদক্ষেপ।

# ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং আমাদের দেশে কেমন প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?

এমরানুল হক: এটি নির্ভর করছে গ্রাহকদের চাহিদার ওপর। এতে কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ জটিলতা তৈরি করছে না। বিশ্বের অনেক জায়গাতেই এটি আছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গায় এমন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি ইউরোপেও এই ইসলামিক শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে। তাই এটি ইতিবাচক বলেই আমি মনে করছি। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা শুরু করেছি ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং। যদি দেখি গ্রাহকরা এটি বেশি বেশি চাইছেন তাহলে আমরা সেদিকে যাব ইনশা আল্লাহ।

# খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বলুন।

এমরানুল হক: ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংখ্যা বেড়েছে। করোনার কারণে ব্যবসায়িকভাবে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবার কেউ আছেন ইচ্ছাকৃতভাবে  খেলাপি হন। আমাদের সরকার করোনা পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে বা সহজ পন্থা তৈরি করে দিয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়েও ঋণের কিস্তি প্রদেয় হচ্ছে। যে ব্যবসাগুলো এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বা সম্পূর্ণরূপে আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারেনি তাদের ঋণ পরিশোধ করতে অসুবিধা হচ্ছে। তারাই ঋণ খেলাপির দিকে চলে যাচ্ছে। আমাদের যারা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান তারা তদারকিতে অনেক বেশি সচেতন। সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলোও সচেতন। ফলে স্বেচ্ছা খেলাপিদের সংখ্যা অনেক কমেছে।

নিউজনাউ/আরবি/২০২২

X