alo
ঢাকা, রবিবার, অক্টোবর ২, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

টিকিট সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় ওমরাহযাত্রীরা

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২২, ১১:৪৩ এএম

টিকিট সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় ওমরাহযাত্রীরা
alo

 

নিউজনাউ ডেস্ক: করোনার কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দীর্ঘ দুই বছর ওমরা ও হজ পালনের জন্য সৌদি আরব যেতে পারেননি। সর্বশেষ ২০২২ সালে করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ার ফলে ওমরা ও হজের অনুমতি দেয় সৌদি সরকার। তবে এ ক্ষেত্রে নানা শর্তও জুড়ে দেয়া হয়। এবার বাংলাদেশ থেকে বড় একটি অংশ হজে গেলেও ৬০ এর ঊর্ধ্বে যাদের বয়স হয়েছে, যাদের করোনা টিকার সনদ নেই, সর্বোপরি হজের টাকা আবাসিক খরচ ও বিমান টিকেটের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেকে রেজিস্ট্রেশন করেও হজে যেতে পারেন নি। ফলে ওমরা যাত্রী আগের যেকোন সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আর অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন। অভিযোগ রয়েছে টিকিট সিন্ডিকেট ওমরা যাত্রীদের জিম্মি করে নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি করছে।

তারা টিকিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা রুটের ৭৫ হাজার টাকার টিকিট বর্তমানে বিক্রি করছে ১ লাখ ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। 

তাদের এই সিন্ডিকেটে জড়িত আছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কয়েক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই সিন্ডিকেটে টিকিট দুর্নীতিতে দুই বছর আগে বরখাস্ত একজন কর্মকর্তা অন্যতম ভূমিকা পালন করছেন বলে দাবি করেছে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের-আটাব নেতৃবৃন্দ।

বিমান প্রদত্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ঢাকা থেকে জেদ্দা ও মদিনা রুটের সেপ্টেম্বর মাসের ইকোনমি ক্লাসের কোনো টিকিট নেই। কেউ যদি সেপ্টেম্বরে বিমানের টিকিটে জেদ্দা রুটে যেতে চায় সেক্ষেত্রে তার ভাড়া পড়বে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর মদিনা রুটের বর্তমান ভাড়া ১ লাখ ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ চলতি মাসে এ ভাড়া দেখাচ্ছে ৭২ থেকে ৭৫ হাজার টাকা।

বর্তমানে বিভিন্ন এজেন্সি সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকায় ১৫ দিনের ওমরাহ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তারা জানান, বিমান কর্তৃপক্ষ ত্বরিত ব্যবস্হা না নিলে সেপ্টেম্বরে এই প্যাকেজ ২ লাখ টাকার বেশি পড়তে পারে।

সূত্র জানায়, একটি টিকিট সিন্ডিকেট মহল অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিতে বেনামে আগামী দেড় মাসের টিকিট বিক্রি করে সংকট সৃষ্টি করছে। আটাব অনতিবিলম্বে নামহীন সকল অবৈধ টিকিট বাতিল করে এজেন্সির মাধ্যমে সিস্টেমেটিক বৈধ নামে টিকিট বিক্রিসহ ওমরাযাত্রীদের চাপ কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালুর জন্য শিগগিরই বিমানের কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত চিঠি দেয়া হবে বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে পাঁচটি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ায় সিন্ডিকেট চক্র ওমরাহ টিকিটের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে চড়া দামে টিকিট বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। বিমানের মতিঝিল অফিসের ম্যানেজার সেলস দেড় মাসের টিকিট নামে বেনামে সিন্ডিকেট চক্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে ওমরাহ এজেন্সির মালিকরা বিমান অফিসে ধর্না দিয়েও ওমরাযাত্রীদের কোনো টিকিট পাচ্ছে না। 

আটাব ও হাব নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন, বিমানের দেড় মাসের ফ্লাইটগুলো যথাযথভাবে চেক করা হলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। তারা ওমরাযাত্রীদের টিকিট সঙ্কট দ্রুত নিরসনের লক্ষ্যে সৌদি আরবের রুটে একাধিক অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু এবং ওমরাহ এজেন্সিগুলোর কাছে সরাসরি টিকিট বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিতকরণে বিমান মন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিমানের টিকিট কাটার জন্য নির্দিষ্ট যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর প্রয়োজন হলেও বিমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পাঁচটি ট্রাভেল এজেন্সি কোনো যাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর বা অন্য কোনো কাগজপত্র জমা না দিয়েই জেদ্দা ও মদিনা রুটের গ্রুপ টিকিট কেটে নিয়েছে। প্রথমে বিমানের বিপণন ও বিক্রয় শাখার কয়েক জন কর্মকর্তা জেদ্দা এবং মদিনা রুটের ইকোনমি ক্লাসের প্রায় ২ হাজার ২০০ টিকিট বিক্রি করেছেন। ঐ এজেন্সিগুলো সেই টিকিট বিভিন্ন হজ এজেন্সির কাছে ৯৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। এই এজেন্সিগুলো ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছে। জেদ্দা ও মদিনা রুটের টিকিট ব্লকে পাঁচটি এজেন্সির সন্ধান পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো-কাজী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড (নয়া পল্টন), রয়েল এয়ার সার্ভিস সিস্টেম (নয়া পল্টন), ইন্যামন অ্যাভিয়েশন লিমিটেড (মতিঝিল), স্টার হলিডেজ (পুরানা পল্টন), দোলা ফকির এয়ার সার্ভিস (তোপখানা রোড)।

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্হাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, নাম ও তথ্য ছাড়া কোনো টিকিট দেওয়া হয়নি এবং নিয়মানুযায়ী বিমানের সেলস সেন্টার থেকেই টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমেও টিকিট বিক্রি অব্যাহত আছে। ওমরাহ যাত্রীদের জন্য বিমানের ভাড়া স্তরভেদে ৭৫০ ডলার হতে ৯০০ ডলার।

এদিকে টিকিট নিয়ে দুর্নীতির কারণে আশরাফুলকে ইতিপূর্বে বিমান থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তার নামে মামলাও রুজু করা হয়। ২০১৯ সালের তদন্তে বিমানের ততকালীন মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের মহাব্যবস্হাপক আশরাফুল আলমকে টিকিট নিয়ে দুর্নীতির প্রধান দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আশরাফুল আলম অনলাইনে টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দেন। অতঃপর কতিপয় ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগসাজশে সিন্ডিকেট করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বিমানের টিকিট ব্লক করে কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পকেটস্হ করেন। এর ফলে বিমানের বহু আসন ফাঁকা অবস্হাতেই উড়াল দিত, কিন্তু যাত্রীরা টিকিট পেতেন না। টিকিট বিক্রির অনিয়মের কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল বিমান। 

তদন্ত কমিটির সুপারিশে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বিমান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার পদচ্যুতির পর বিমান পুরোপুরি অনলাইন টিকিট সিস্টেম চালু করেছিল। এর ফলে বিমানের টিকিটের বিক্রি ও আয় বাড়ে। তবে আবু সালেহ মুস্তফা কামাল বিমানের ব্যবস্হাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার এক মাসের মাথায় আশরাফুলকে দায়িত্বে পুনর্বহাল করা হয়। এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও আশরাফুল বহালতবিয়তে আছেন। 

নিউজনাউ/আরবি/২০২২

X