alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

৩১৭ কোটি টাকার ঘাটতি, ঝুঁকিতে নগদের গ্রাহকরা

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২২, ০৭:৩৫ পিএম

৩১৭ কোটি টাকার ঘাটতি, ঝুঁকিতে নগদের গ্রাহকরা
alo


নিউজনাউ ডেস্ক: বাংলাদেশ ডাক বিভাগ মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নগদকে ডিজিটাল সেবাদানকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডাক বিভাগের এমএফএসের জন্য জারি করা একটি অস্থায়ী লাইসেন্সের অধীনে কাজ করছে নগদ।

অপরদিকে নগদের কারিগরি সহযোগী থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক্সিম ব্যাংক থেকে নগদের গ্রাহকদের অর্থ জমা রাখে 'ট্রাস্ট ফান্ডের' বিপরীতে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয় থার্ড ওয়েভ। যেখানে এমএফএসের নিয়ম লঙ্ঘন করে গ্রাহকদের অর্থ জামানত হিসেবে ব্যবহার করে তারা। ঋণের জামানত রাখার পর নগদের অ্যাকাউন্টে তৈরি হয় ঘাটতি। অথচ, এমএফএসের শর্ত অনুযায়ী, ই-মানির পরিমাণ অবশ্যই লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকার সমপরিমাণ হতে হবে।

থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩১৭ কোটি টাকার বকেয়া ঋণের চাপে এখন হিমশিম খাচ্ছে ডাক বিভাগ। নগদের অ্যাকাউন্টের ঘাটতি পূরণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডাক বিভাগকে ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এতেই ডাক বিভাগের সঙ্গে জটিলতায় জড়িয়েছে নগদ।

এদিকে ডাক বিভাগ পঞ্চমবারের মতো অস্থায়ী লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলে বাংলাদেশ ব্যংক প্রথমবার নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকের মালিকানাধীন থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের ঋণের বিষয়টি উত্থাপন করে।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পঞ্চমবারের মতো নগদের অন্তর্বর্তী লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ালেও চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থের বিপরীতে নেওয়া ঋণ সামঞ্জস্য করার শর্ত দেয়।

এদিকে মোট ঋণের মধ্যে ৩১৭ কোটি টাকা অনাদায়ী হওয়ায় এক্সিম ব্যাংক বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করে। তারা জানায়, থার্ড ওয়েভ টেকনোলজির কাছে বারবার চাওয়ার পরেও তারা বকেয়া পরিশোধ করেনি।

এমএফএস লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠিটি ডাক বিভাগের কাছে পাঠায়।

ট্রাস্ট ফান্ডের ৩১৭ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তানভীর আহমেদ মিশুককে চিঠি দেয়।

মোট ঋণের ৩১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা বকেয়া হলে এক্সিম ব্যাংক চলতি বছরের মার্চ মাসে ঋণের জামানত থাকা নগদের ট্রাস্ট ফান্ড থেকে নিয়ে সেই অর্থ সমন্বয় করে।

এক্সিম ব্যাংক বকেয়া ঋণ আদায়ের পর নগদ গত ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এক্সিম ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলে, ব্যাংকটি বেআইনিভাবে ঋণ সমন্বয় করেছে। ন্যায়বিচার দাবি করে এক্সিম ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানও জানায় তারা।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৬ মে নগদকে একটি চিঠিতে বলে, গ্রাহকের অর্থের বিপরীতে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস-এর ঋণ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নগদকে এই নিয়ম লঙ্ঘন সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশদানের পরেও তারা সেই নির্দেশাবলী অনুসরণ করেনি।

আর তাই ঋণ সমন্বয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিষয় উল্লেখ করে এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু করার নেই বলে চিঠিতে বলা হয়।

এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া বলেন, ঋণ বকেয়া হওয়ার পর তারা বৈধভাবে অর্থ আদায় করেছেন।

ঋণ সমন্বয়ের পরে নগদের ট্রাস্ট ফান্ড ৩১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঘাটতিতে রয়েছে অর্থাৎ নগদের ই-মানির হিসাব তাদের কাছে থাকা মূল অর্থের চেয়ে বেশি।

ট্রাস্ট ফান্ড নির্দেশিকা অনুসারে, ফান্ডের মূল্য প্রত্যকে দিবসে দিনশেষে ই-মানির সমান বা তার বেশি হতে হবে।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস জনগণের অর্থকে বন্ধক হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ নিয়েছে যার ফলে ই-মানির সঙ্গে প্রকৃত টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে যা ২০১৮ সালের বাংলাদেশ মোবাইল আর্থিক পরিষেবা (এমএফএস) রেগুলেশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নগদের ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অনুরোধ বিবেচনা করে গ্রাহকদের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়িয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়।

তবে লাইসেন্সের শর্ত হলো, বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে এক বছরের মধ্যে ঋণ সমন্বয় করতে হবে অথবা মালিকপক্ষকে নিজস্ব অর্থ জমাদানের মাধ্যমে জনগণের অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস এক্সিম ব্যাংকে জামানত হিসেবে থাকা অর্থের সমন্বয় না করা পর্যন্ত ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এককভাবে দায়ী থাকবে।

এখন ডাক বিভাগ ৩১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঘাটতি পূরণের বোঝার মধ্যে রয়েছে। কারণ ডাক বিভাগের নামে এমএফএস লাইসেন্স তৈরি করায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পোস্ট অফিসকে নগদের সমস্ত দায়-দায়িত্বের জন্য দায়ী করছে।

বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের লাইসেন্স ইস্যু করাও কিছুটা জটিল প্রক্রিয়া। প্রবিধান অনুযায়ী, একটি এমএফএস কোম্পানি নিজে থেকেই তৈরি হতে বা থাকতে পারে না, তবে অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার সহায়ক হতে পারে। যেমন- বিকাশ ব্র্যাক ব্যাংকের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং রকেট ডাচ-বাংলা ব্যাংকের।

একটি সম্পূর্ণ লাইসেন্স পেতে বাংলাদেশ পোস্ট অফিসকে একটি কোম্পানি গঠন করতে হবে, যেনো নগদকে তার সহযোগী হিসেবে চালানো যায়। পাঁচটি এক্সটেনশন দেওয়া সত্ত্বেও, নগদ এখনও বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হতে পারেনি। এরমধ্যে শেষ এক্সটেনশনটি ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে যেহেতু নগদ একটি এমএফএস হিসেবে একা কাজ করতে পারে না, তাই এটি একটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে। এই পন্থা নগদের কার্যক্রমকে বৈধ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে জনগণের অর্থের ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের নতুন মার্চেন্ট অধিগ্রহণ কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে, জনসাধারণের অর্থের ঘাটতি পূরণের পরিবর্তে নগদ এক্সিম ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে একটি রিট আবেদন করে।

পিটিশনে নগদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ স্তরের ৭ কর্মকর্তাকে বিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে। বিবাদীরা হলেন- গভর্নর, ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগের ডেপুটি গভর্নর, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকিং পরিদর্শন বিভাগ-৭-এর ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং ব্যাংকিং পরিদর্শন বিভাগ-৭-এর মহাব্যবস্থাপক।

উল্লেখ্য, যাত্রা শুরুর মাত্র দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ৫৩ মিলিয়ন গ্রাহক নিয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এমএফএস হয়ে উঠেছে নগদ। এমএফএস ওয়েবসাইট অনুসারে, প্রতিষ্টানটির দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা। সরকার সমর্থিত এমএফএস প্রদানকারী হিসেবে সরকারি লেনদেন পরিচালনা করে দ্রুত গ্রাহক অর্জন করতে সমর্থন হয়েছে তারা।

নিউজনাউ/আরবি/২০২২
 

X