alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

খুলছে বেকুটিয়া সেতু, চাঙ্গা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ০৮:১৪ পিএম

খুলছে বেকুটিয়া সেতু, চাঙ্গা হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি
alo


অরণ্য মামুন: স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দুই মাস নয় দিন পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আরও একটি স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। ৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হচ্ছে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব অষ্টম-বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু। 

বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের কঁচা নদীর ওপর নির্মিত এ সেতুটি এই দুই  বিভাগের মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করে পূরণ করতে যাচ্ছেন। আর একই সময় সেতুটির পিরোজপুর প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগ করবেন।

বরিশাল–খুলনা বিভাগের মধ্যে সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় বাধা পিরোজপুরের কঁচা নদী। যানবাহনকে এই নদী পার হতে হয় ফেরির মধ্য দিয়ে। আর ফেরির জন্যে এই জনপথের মানুষদের ফেরিঘাটে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। আর ফেরিঘাটে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরি পার হতে হয়। এছাড়া মাঝে মধ্যে ফেরি বিকল হয়ে পড়লে তখন অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়। আর এতে করে সময় যেমন নষ্ট হয় তেমনি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই জনপথের মানুষ।

এই দুর্ভোগ লাগব করতে এই নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর দুই বছর পরে ২০১৮ সালের অক্টোবর 'প্রী-স্ট্রেসড কংক্রিট বক্স গার্ডার' ধরনের এ সেতুটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'চায়না রেলওয়ে সেভেনটিন ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড' নির্মাণকাজ শুরু করে। যার মধ্য দিয়ে  বরিশাল-খুলনা বিভাগের সড়ক যোগাযোগে নতুন আশার আলো দেখতে শুরু করেন দক্ষিণের এ অঞ্চলের মানুষ। 

প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটির উভয় প্রান্তে ৪৯৫ মিটার ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫০০ মিটার। ১৩ দশমিক ৪০ মিটার প্রস্থ সেতুর মূল দৈর্ঘ্য ৯৯৮ মিটার। ৯টি স্প্যানে এবং ৮টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বক্স গার্ডার টাইপের সেতুটি। ৯টি স্প্যানের ৭টি ১২২ মিটার এবং ৭২ মিটার স্প্যান রয়েছে আরও ২টি। সেতুটির পিরোজপুর ও বরিশাল প্রান্তে ১ হাজার ৪৬৭ মিটার সংযোগ সড়কসহ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে আরও ২টি ছোট সেতু ও বক্স কালভার্ট নির্মিত হয়েছে। আর এ সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৮৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৫৪ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে চীন সরকার। বাকি ২৪৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে।

প্রায় ৪ বছর ধরে নির্মিত সেতুটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দৃশ্যমান হয়। আর এর ৮ মাস পর নির্মাণ শেষে গেলো ৭ আগস্ট চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ঢাকার চীনা দূতাবাসের ইকোনমি মিনিস্টার বাংলাদেশর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি হস্তান্তর করেন।

চট্টগ্রাম, বরিশাল এবং মোংলা বন্দর সহ খুলনা নদী বন্দরের সাথে পণ্য ও জ্বালানীবাহী বড় ধরনের নৌ-যানের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে কঁচা নদীর সর্বোচ্চ জোয়ারের থেকে ৬০ ফুট উচ্চতায় সেতুটি নির্মিত হয়েছে। ফলে নৌ-বাহিনীর ফ্রিগেট সহ যেকোনো ধরনের যুদ্ধ জাহাজের চলাচলেও কোন প্রতিবন্ধকতা থাকছে না। এমনকি কঁচা নদীর মধ্যভাগে সেতুটির তলদেশে সবচেয়ে প্রশস্ত স্প্যানটিতে ১২২ মিটার এলাকা নৌ-যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে মূল সেতু ও সংযোগ সড়ক সহ নদী শাসনের কাজও শেষ হয়েছে।

পদ্মা সেতু চালু পর বরিশাল হয়ে যেসব যানবাহন খুলনা মোংলা বন্দরে যাতায়াত করতো এই বেকুটিয়া ফেরি ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। ফলে পদ্মা সেতুর শতভাগ সুফল ভোগ করতে পারতো না এই অঞ্চলের মানুষ। সেতুটি উদ্বোধন হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে পদ্মার এ পাড়ের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগে আর কোনো বাধা থাকছে না। ফেরিবিহীন নতুন এক বাংলাদেশের দেখা মিলবে এই সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে।

প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত সেতুটি উদ্বোধনের খবরে আনন্দ আর খুশিতে ভাসছেন বরিশাল পিরোজপুর খুলনাসহ এ অঞ্চলের মানুষ। বেকুটিয়া সেতু চালুর মধ্য দিয়ে বরিশালের সঙ্গে খুলনায় সড়কপথে আর কোনো ফেরি থাকছে না। এর মধ্য দিয়ে পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে মোংলা সমুদ্রবন্দরের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে। ফলে ভোগান্তি দূর হবে সেইসাথে যাতায়াতে সময়ও কমে আসবে।

বরিশাল থেকে ভারতগামী যাত্রীদের আগে ২৫৫ কিলোমিটার সড়ক পথ পারি দিতে হতো। সেতুটি খুলে দিলে বরিশাল রুপাতলি থেকে ২০১ কিলোমিটার পারি দিয়ে বেনাপোলে পৌঁছাতে পারবে ভারতগামী যাত্রীরা। এতে ৫৫ কিলোমিটারের সড়ক পথ কম পারি দিতে হবে এই পথের যাত্রীদের। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের বরিশাল, কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরিবিহীন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বপ্নের দুয়ার খুলে যাবে বলে মনে করেন এই জনপথের মানুষ। সেইসাথে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পায়রা বন্দর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ  ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। 

পিরোজপুর সদর প্রান্তে অত্যাধুনিক কম্পিটিউরাইজড টোল প্লাজা প্রস্তুত হয়েছে। সেতু ব্যবহারকারী যানবাহন চলাচলের জন্য টোল নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।

ট্রেইলার ৩১৫ টাকা, হেভি ট্রাক ২৫০, মাঝরি ট্রাক ১২৫, বড় বাস ১১৫, মিনি ট্রাক ৯৫, কৃষি কাজে ব্যবহৃত যান ৭৫, মিনিবাস ৬৫, মাইক্রোবাস ৫০, ফোর হুইল চালিত যানবাহন ৫০, সেডান কার ৩০, ৩ও ৪ চাকার যান ১৫, মোটরসাইকেল ৫, এবং  রিকশা, ভ্যান, বাইসাইকেলকে ৫ টাকা টোল দিয়ে সেতু পার হতে হবে।

পিরোজপুরবাসীসহ আশপাশের জেলার মানুষ সেতু উদ্বোধনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রহর গুনছেন। এই সেতু চালু হলে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, বেনাপোল, খুলনা, মোংলা বন্দরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়কপথে বরিশাল হয়ে ঢাকা এবং বরগুনা, কুয়াকাটার পথে চলাচলকারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে। 

বেকুটিয়া ফেরিঘাটের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের শিকার থেকে মুক্তি পাবে পরিবহন, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা।  পিরোজপুরের মতো একটি বিচ্ছিন্ন পৌরসভা শিল্প-কলকারখানা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি চালু হলে খুলে যাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে খুলনা হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের বরিশাল, কুয়াকাটা পর্যন্ত ফেরিবিহীন নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার স্বপ্নের দুয়ার। এর ফলে গতি আসবে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে। প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত বরিশালের পণ্য সরাসরি সড়কযোগে পৌঁছে যাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বরিশাল বিভাগ পা ফেলবে নতুন এক দিগন্তে।

২০২২ সাল বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ নতুন বিপ্লব শুরু হয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর চালু হতে যাচ্ছে এই সেতু। এরপর নড়াইলের ৬ লেনের কালনা সেতু এবং নারায়ণগঞ্জের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর নির্মাণ কাজও শেষের পথ। শিগগিরিই চালু হবে এই দুইটি সেতুও। প্রতিদিনের নতুন সূর্যের মতো ফেরিবিহীন এক নতুন বাংলাদেশের দেখা মিলছে।

নিউজনাউ/আরবি/২০২২

X