alo
ঢাকা, শনিবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২২ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

২১ আগস্ট: নতুন মন্ত্রে দীক্ষা নিতে হবে

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২২, ০৯:৫২ এএম

২১ আগস্ট: নতুন মন্ত্রে দীক্ষা নিতে হবে
alo

 

এম. নজরুল ইসলাম: শরতে বাংলার আকাশের রঙ বদলে যায়। বর্ষায় যে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা, সেই আকাশই শরতে শ্বেতশুভ্র। শরৎ মানেই তো শুভ্র প্রকৃতি। আকাশে যেমন সাদা মেঘের ভেলা, তেমনি শুভ্র কাশ ও শিউলি প্রকৃতিকে যেন শুভ্রতার পোশাক পরিযে দেয়। কিন্তু এই শরতেই, বাংলার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। শরতের শুরু মানেই তো আগস্টের মধ্যভাগ। এমনিতেই বাংলাদেশে আগস্ট মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই আগস্টে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই আগস্টে, বিগত জোট সরকারের আমলে জঙ্গীরা তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়ে। সেই দিনটা ছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। এর এক বছর আগে, বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা গ্রেনেড হামলা করা হয়।

এতে শেখ হাসিনা আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন দুই শতাধিক নেতাকর্মী। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সেদিন রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। হতাহত নেতাকর্মীদের আর্তনাদ ও বাঁচার আকুতিতে সৃষ্টি হয়েছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? আমরা কি নিছকই রাজনৈতিক একটি সংঘর্ষ বলে ধরে নেব? নাহ, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা তেমন কিছু নয়। বরং এর শিকড় নিহিত রয়েছে ১৯৭৫ সালে। যেমন- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের শিকড় ১৯৭১ সালে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলাও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল স্বাধীনতার পক্ষকে নির্মূল করার একটি বৃহৎ অপপ্রয়াস। ইংরেজিতে কী বলা যেতে পারে? লিগ্যাসি? এই শব্দের আভিধানিক যে অর্থ সেটি খুবই ইতিবাচক-উত্তরাধিকার। তাহলে কি পরম্পরা?

নাহ, ২১ আগস্টের ঘটনার ক্ষেত্রে এ শব্দটিও ঠিক প্রযোজ্য হবে না। তাহলে? আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হঠাৎ করে ঘটেনি। যেমন, হঠাৎ করে টর্নেডো আসে, উড়িয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি-গাছপালা- ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা তেমন কোনো ঘটনা নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধপরায়ণতার করুণ পরিণতি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তারই ধারাবাহিকতা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট; একাত্তরের পরাজিত শক্তির ঘৃণ্য প্রতিশোধস্পৃহার ধারাবাহিকতা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের সন্ত্রাসবিরোধী সভা চলছিল। খোলা ট্রাকে বানানো উন্মুক্ত মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছেন তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা, এখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বক্তৃতা শেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। ঠিক সেই সময় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলো পৈশাচিক গ্রেনেড হামলা। মুহূর্তে যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো গোটা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ।
সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেদিন অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও নিহত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মী ও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন পাঁচ শতাধিক মানুষ। দলীয় সভানেত্রীকে বাঁচানোর জন্য ট্রাকের ওপর মানববর্ম রচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেদিনের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনেককে। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।

কী ঘটেছিল সেদিন? মিছিল উপলক্ষে বিকেল ৪টা থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষে ভরে ওঠে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। ৫টার দিকে বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে সমাবেশস্থলে পৌঁছান শেখ হাসিনা। বক্তৃতায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা বন্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন।

প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঘোষণা দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডগুলোর মধ্যে তিনটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। শত শত মানুষের আর্তচিৎকার, ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্ত আর পোড়া গন্ধ, সব মিলিয়ে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। আহতদের সাহায্য করার বদলে বিক্ষুব্ধ এবং আহত মানুষের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে সবাই।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেদিন সংসদে কোনো শোক প্রস্তাবও তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। শোক প্রস্তাব তুলতেই দেয়া হয়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সেদিনের সেই গ্রেনেড হামলায় যে চারদলীয় জোটের ইন্ধন ছিল তা আজ অনেকটাই প্রমাণিত সত্য। আর সে কারণেই সেদিন জোট সরকার গ্রেনেড হামলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। সিআইডিকে দিয়ে সাজানো হয়েছিল জজ মিয়া প্রহসন।

বর্বর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। কোনো গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সভ্য দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসভায় এমন বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে পারে, তা ভাবনারও অতীত। গ্রেনেড হামলার ঘটনার পর এলাকায় নিয়োজিত পুলিশ হামলাকারীদের আটক করার ব্যাপারে কোনো চেষ্টা কি করেছিল? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি। গ্রেনেড হামলার পর দ্রুত ঘটনার আলামত নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডে চারদলীয় জোটের অনেক নেতা শোক প্রকাশের বদলে হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার জনসভায় এ রকম পৈশাচিক হামলার পরও দুঃখ প্রকাশ কিংবা লজ্জিত হওয়া তো দূরে থাক, আমাদের নষ্ট রাজনীতির নির্লজ্জ ঐতিহ্য ধরে তৎকালীন সরকারি দলীয় নেতৃত্ব হামলার জন্য উল্টো আওয়ামী লীগকেই দোষারোপ করে। মামলার তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার নানা চেষ্টা করা হয়।

বিগত জোট সরকারের সময় তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে এ দেশে জঙ্গিবাদ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল, এ সত্য আজ আর অস্বীকার করা যাবে না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানী ঢাকার এক জনাকীর্ণ স্থানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছিল, সেটি যে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নীলনকশা ছিল; তাও এখন সবার কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে অপশক্তি যে উল্টোপথে দেশ-জাতিকে ঠেলে দিয়েছিল, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা তারই ধারাবাহিক অপপ্রক্রিয়া। অবশ্য এর আগেও এমন প্রচেষ্টা ওরা চালিয়েছিল কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রেখে।

২১ আগস্টের ঘটনার সময় যে দল বা জোট ক্ষমতায় ছিল, তারা সে হামলার ঘটনার কোনো বিচার করেনি। সেই ২৪ জনের হত্যার বিচার করেনি তৎকালীন সরকার। তদন্তের ভান করেছিল। ইন্টারপোলের সাহায্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপর চুপচাপ ছিল সেদিনের সরকার। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে গ্রেনেড হামলা ও হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেয়।

আমরা বলে থাকি, আগস্ট আমাদের শোকের মাস। শোকের শুধু নয়, আগস্ট আমাদের শক্তি সঞ্চয়ের মাসও। এই মাসেই আমরা জাতির পিতাকে হারিয়েছি। আবার শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনের দিকে পথ চলার দৃপ্ত শপথ নিয়েছি।

আজকের এই দিনে আমাদের নতুন এক শপথ নিতে হবে। জঙ্গীবাদের দোসরদের কোনোভাবেই আশ্রয় দেয়া যাবে না। হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের আস্থায় আনা যাবে না। মনে রাখতে হবে, জঙ্গীবাদের মদতদাতারা কোনোদিন চরিত্র বদল করতে পারে না। পিশাচের আসল চেহারা একসময় ঠিকই বাইরে বেরিয়ে আসে। আজ ২১ আগস্টের দিনে তাই জাতিকে পাঠ করতে হবে নতুন শপথ; দীক্ষা নিতে হবে নতুন মন্ত্রে। ইতিহাসের এই কালো দিনটিকে স্মরণ করে আলোর ইতিহাস গড়তে হবে।

সূত্র: সময় নিউজ।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি।

X