alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সমন্বয় নিয়ে এতো বিভ্রান্তি কেন?

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২২, ০৮:৪৬ পিএম

সমন্বয় নিয়ে এতো বিভ্রান্তি কেন?
alo

 

শিপন হালদার: জ্বালানি সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ। এই সংকট মোকাবেলায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এরমধ্যে সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, লোডশেডিং এর সময় নির্ধারণ, অফিসের নতুন সময়সূচি, নতুন অফিস (ব্যাংকসহ) সময়সূচি, পাম্প বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত, কারখানায় সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক ছুটি, ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা খোলা না রাখার নির্দেশনাও রয়েছে। কারণ, জ্বালানি সংকটের কারণে সবক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতিও সংকটে। পরিবহণ সেক্টরে চলছে অরাজকতা। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ।

গত ৫ আগস্ট রাত থেকে হঠাৎ ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ৪৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসি নিয়েও কম আলোচনা-সমালোচনা চলছে না। রাশিয়া থেকে ডিজেল আনার প্রক্রিয়াও চলমান। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় বাংলাদেশেও মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। প্রতি লিটারে কমানো হয়েছে ৫ টাকা করে। সোমবার (২৯ আগস্ট, ২০২২) জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা বা ৪.৩৯ শতাংশ কমিয়ে করা হয় ১১৪ টাকা থেকে ১০৯ টাকা। আর অকটেন লিটারে ৫ টাকা বা ৩.৭০ শতাংশ কমিয়ে ১৩৫ টাকা থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি পেট্রল লিটারে ৩.৮৫ শতাংশ কমিয়ে ১৩০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২৪ দিন আগে অর্থাৎ ৫ আগস্ট গড়ে যেখানে বাড়ানো হয়েছিল ৪৬.৯৬ শতাংশ, গড়ে তা কমানো হয়েছে ৪.০৮ শতাংশ।

তবে ভোক্তারা, জ্বালানি তেলের সামান্য দাম কমানোর সুফল তাদের পর্যায়ে আসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কারণ বাংলাদেশে একবার কোনকিছুর দাম বেড়ে গেলে তা আর কমার নজির নেই। সঙ্গতকারণেই সাধারণ মানুষ সন্দিহান। তেলের দাম কমলেও নিত্যপণ্য, পরিবহণ ভাড়া ইত্যাদি কমবে কি না? যদিও সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ ভাড়া কমানোর আশ্বাস দিয়েছে। আর চাল, ডালসহ ৯টি নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, ভোজ্যতেলের মতো চাল, গম (আটা-ময়দা), চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রড ও সিমেন্টসহ ৯টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেবে সরকার। ট্যারিফ কমিশন আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এসব পণ্যের যৌক্তিকমূল্য বের করবে। কেউ নির্ধারিত মূল্যের বেশি নিলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

যদিও নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে একমত নন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক। মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) সচিবালয়ে কৃষিপণ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাহলে কী হবে? এগুলোর দাম...ই করে দিয়ে, এগুলো খুব হয় না। এগুলো...মার্কেটে সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড (সরবরাহ ও চাহিদা), এটা হলো ইকোনমিকসের বেসিক থিউরি।'

এর মাধ্যমে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি বার বার সামনে চলে আসছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টা ফার্মেসি খোলা না রাখার বিষয়টি নিয়ে বলতে চাই। গত ২২ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে ১ সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা কোন প্রতিষ্ঠান কখন বন্ধ থাকবে তা নির্ধারণ করে দেয় সংস্থাটি। এতে বলা হয়, সাধারণ ওষুধের দোকান বন্ধ করতে হবে রাত ১২টার মধ্যে। হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত নিজস্ব ওষুধের দোকান বন্ধ করতে হবে রাত ২টার মধ্যে। এমন সিদ্ধান্ত নিয়েও কম-বেশি আলোচনা-সমালোচনা চলছে সবখানে।

ডিএসসিসির এমন গণবিজ্ঞপ্তি পর ২৫ আগস্ট ২০২২ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, রাত ২টা পর্যন্ত নয়, ২৪ ঘণ্টাই ওষুধের দোকান খোলা থাকবে। স্বাস্থ্যসেবা হলো জরুরিসেবা। আমরা কোনো হাসপাতালের টাইমিং কমাইনি। ২৪ ঘণ্টা সেবা বজায় রেখেছি। শুধু অফিসকেন্দ্রিক বা সিভিল সার্জন অফিস সেখানে ৮টা থেকে ৩টা করেছি। তাছাড়া সব হাসপাতাল তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সেখানে সময়টা অপরিবর্তিত থাকবে এবং ওষুধের দোকানের বিষয়ে আমরা বন্ধ করার জন্য কোনো নির্দেশনা দেইনি।

অন্যদিকে, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিশ্চিত না করে ২৪ ঘণ্টা ওষুধের দোকান খোলা রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। মঙ্গলবার ৩০ আগস্ট, ২০২২ তিনি বলেন, হাসপাতালে সংযুক্ত ওষুধের দোকান ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। কারণ, যেখানে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সুনির্দিষ্ট সময়ের পর এবং শুক্র-শনিবার এবং রাতে চিকিৎসকই পাওয়া যায় না সেখানে ওষুধের দোকান কেন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হবে? 

ফার্মেসি খোলা রাখা নিয়ে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ডিএসসিসি মেয়র দুই মেরুতে অবস্থান করছেন। এর মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়, নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ ও ফার্মেসি ২৪ খোলা রাখা নিয়ে সরকারের মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। সাধারণ মানুষ এতে আরো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছেন। মূল্য সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের মতো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। না হলে সরকারের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হবে। যা জ্বালানি সংকটের থেকেও ভয়াবহ হতে পারে!

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নিউজনাউ টোয়েন্টি ফোর ডট কম।

X