alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মেঘাচ্ছন্ন শনিবার বিকেল

প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২২, ০৬:২১ পিএম

মেঘাচ্ছন্ন শনিবার বিকেল
alo
আফজাল হোসেন : ইদানীং মাঝে মাঝে আমি ফারুকী হয়ে যাই। আমাদের দেশের প্রতিভাবান চিত্রনির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে চিনি অনেককাল ধরে। কোথা হতে কোথায় এসে সে দাঁড়িয়েছে দেখে বিস্মিত হই। সে বিস্ময়ের কারণে এই কৃতীকে ‌‘তিনি’ বলা উচিত। বয়সে ছোট আর অনেক দিনের চেনা, তাই ‘সে’ বলার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কথাও ঠিক, মনে কারও জন্য প্রকৃত সমীহ যদি থাকে, আপনি, তুমি সম্বোধনে সমীহ উনিশ-বিশ হয়ে যায় না। ইদানীং সত্যিই মাঝে মাঝে আমি ফারুকী হয়ে যাই। যার কেউ ছিল না, এখনও নেই- সেই মানুষটা চলচ্চিত্রের প্রেমে মজে নিজেকে পাল্টে ফেলেছে। এই পাল্টানোয় লাভ শুধু তার নিজের হয়নি, লাভ হয়েছে দেশেরও। যখন কোনও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেশের একটা চলচ্চিত্র ও তার নির্মাতাকে আগ্রহ নিয়ে ভাবা ও দেখা হয়, উচ্চারিত হয় দেশের নাম। তা আমাদের গৌরবান্বিত করে, সম্মানিত হয় দেশও। মাঝে মাঝেই আমি ফারুকী হয়ে যাচ্ছি। তার কারণ, সে একজন সৃজনশীল মানুষ। যেকোনও সৃজনশীল মানুষকে দরকারি মনে হয়। মনে হয় কাছের, নিজের। ফারুকীর আশা, স্বপ্ন, সাধ সবই চলচ্চিত্রকে ঘিরে। একজন সৃজনশীল মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে চান। আগে যা করা হয়েছে, তার চেয়ে উচ্চতর কিছু করার বাসনা মনে থাকে। সে বাসনা সহজসাধ্য নয় মনে হলেও সৃজনশীলতার শক্তি হার স্বীকার করতে দেয় না। ‘শনিবার বিকেল’ নামে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সংকটে পড়েছে ফারুকী। বিষয়টা সত্য ঘটনানির্ভর এবং স্পর্শকাতর। শুনেছি, ‘শনিবার বিকেল’-এ চলচ্চিত্রের নির্মাণ পদ্ধতি অনেক আলাদা, প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ। জেনে-বুঝেও নির্মাতার মনে সম্ভব করার প্রত্যয় অটুট ছিল। তার স্বপ্ন সাধের চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। তারপরের যে ঘটনা, তা যেকোনও সৃজনশীল মানুষের জন্য দারুণ মর্মবেদনার, হতাশার। সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটা বানানো। তার মানে এমন নয়, হলি আর্টিজান নামের একটা কফি শপে একদা অতি ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটেছিল, সেই রক্তারক্তি কাণ্ড ভালো পুঁজি বলে বিবেচনা করার মতো। প্রবল পীড়াদায়ক, ভয়ংকর সেই ঘটনার কথা দেশ-বিদেশের মানুষেরা জানে। এমন বিষয়কে কীভাবে দেখে চলচ্চিত্রকার। একজন সৃজনশীল নির্মাতা সত্য ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমা বানায়, সত্য ঘটনা বর্ণনা করার জন্য নয়। নিজের একটা দর্শন থাকে, তা প্রকাশের বাহন হয়ে ওঠে কোনও ঘটনা। যে মানুষ নিষ্ঠা দিয়ে বহুকাল জুড়ে নিজের একটা আমলনামা তৈরি করতে পেরেছে, তার ওপর খানিকটা ভরসা তো করাই যায়। সিনেমাটা না দেখেও বলে দেওয়া যায়, দায়িত্বশীলতা রয়েছে যার, সে মানুষ ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে দর্শক কুপোকাতের উপাদান রয়েছে ভেবে বিষয় বেছে নেয়নি। রক্তারক্তি কাণ্ড, সত্য একটা ঘটনা, ভয়, শিহরণ, কৌতূহল জাগানো যাবে ভেবে সিনেমা বানানোর সাধ কার হবে এবং কার হবে না তা আমলনামা বলে দিতে পারে। যেকোনও বিষয় নিয়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মিত হলো- তা নিয়ে বহুজনের বিচিত্র মতামত খুবই স্বাভাবিক। এক একজন নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টাকে দেখবে, বিবেচনা করবে। সৃজনের কাজ, মূল দায়িত্বই হচ্ছে মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা। ঢিল ছুড়লেই জলে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। ঢিল ছাড়া জল নিস্তরঙ্গ, নির্বিকার। অনেক দিন হয়ে গেলো, ফারুকী নির্মিত ‘শনিবার বিকেল’ আটকা পড়ে আছে। মুক্তি মিলছে না। একজন সৃজনশীল মানুষের ভাবনা, কর্ম সম্পর্কে কপালে ভাঁজ ফেলে অগ্রিম বিচার-আচার চলতে থাকলে তা স্বস্তি, শান্তির হয় না। শিল্পযাত্রায় মানুষ এ দেশ, সমাজে এক প্রকার সঙ্গীহীন, অভিভাবকহীন। বলেছি, যার কেউ ছিল না, এখনও কেউ নেই। এই না থাকা বলতে স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বোঝানো নয়। যারা স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠে, তাদের সকলেরই ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে..’ মুখস্থ। এখানে একা একাই এগোতে হয়। একা এগোনো মানে পদে পদে নানা প্রতিকূলতা, নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচয় ঘটে- এটাই নিয়ম। মনে বড় স্বপ্ন পোষা মানুষেরা থামে না। তেমন মানুষদের যাত্রা ও তার ফলাফল অদৃশ্য নয়। আগ্রহ থাকলে আমরা জানতে পারি, নিজ আনন্দে এগিয়ে চলা একজন মানুষ ও তার কর্ম কতখানি বিশেষ। কতটা অর্থবহ হয়, হয়ে থাকে। অর্থের জোগান দেয় না এমন বহু কর্মে মানুষ প্রবলভাবে নিবেদিত থাকে- এ কথা অনেকেরই জানা। অর্থের চেয়ে অর্থবহ কর্মের প্রতি যাদের বিশেষ মনোযোগ, তাদের উদ্যোগ, স্পৃহা নিয়ে শঙ্কা বা সন্দেহ মোটেও স্বাভাবিক নয়। দেখা যায়, বহু অস্বাভাবিকতা অনেক দায়িত্বশীল মানুষদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে নিত্য বেড়ে উঠছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এমন আশ্রয় প্রশ্রয় আমরা ব্যক্তিস্বার্থে মেনে নিতেও শিখেছি, শিখছি। এমন শিক্ষার যত বিস্তৃতি- ততই সর্বনাশের হা বড় হচ্ছে। আমরা যত বেশি সত্যের ভয়ে অস্থির থাকবো, সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবো। সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা ইত্যাদি থেকে যত বেশি দূরে সরবো- কালো মেঘ জমবে, জমতেই থাকবে। যত বেশি নিজ নিজ অঙ্ক মিলিয়ে সন্তুষ্ট থাকবার চেষ্টা অব্যাহত রাখবো, সর্বনাশ অতি আমোদে দ্রুত গিলতে পারবে আমাদের। আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে হয়তো, যারা বলে- এটা বুঝি না, ওটা বুঝি না। বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা করে কেউ কি ব্যর্থ হয়েছে কখনও! যার যার নিজের মতো বুঝলে খুব দোষের হবে, বলেনি কেউ। এক শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষের ভাবনার প্রতি সমীহ রেখে আর এক সংবেদনশীল মানুষের মন যে অর্থ বুঝে, উপভোগ করবে- তা ভুল নয়। জীবনানন্দ দাশ ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’ যখন লিখেছেন- ঠিক কি মনে করে লিখেছিলেন, তা-ই পাঠককে খুঁজতে নেমে বুঝতে হবে, এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। আমি আমার মতো করে কবিতাটা বুঝে, তার স্বাদ নিতে পারি। এখানে পাঠক স্বাধীন। কিন্তু স্বাধীনতা রয়েছে বলে তার স্বাদে অধিক উজ্জীবিত হয়ে বলতে পারি না, পাখির নীড়ের বদলে একটু নরম মোলায়েম কোনও উপমা ব্যবহার করলে কবিতাটা সুখকর হতো। আমরা অনেকেই মন্দ নিয়ে সদা শঙ্কিত, সন্ত্রস্ত থাকি। ভালোর চর্চা, অনুশীলন রয়েছে বলে সেসবের প্রতিক্রিয়া বহু সংকট ঘনীভূত হতে দেয় না। নিত্য জীবন ও বেঁচে থাকাকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে শিল্পমনস্কতা- অলক্ষে। শিল্পচর্চার প্রতি মানুষের প্রেম চিরকালীন। সভ্যতার শুরু থেকে যা মানুষের সুখে থাকার ও রাখার অবলম্বন- এ কারণ ও কারণ দেখিয়ে তা দোষের বিবেচনা করা হয় কালে কালে। দোষ বিবেচনাকারীদের যুক্তির অভাব হয় না, তবে গুণ শনাক্তের সক্ষমতা সম্পর্কে সংশয় থেকে যায়। উদাহরণ বহু পাওয়া যাবে। অভিনেতা দিলীপ কুমারের একদা মন খারাপ হয়েছিল। সে শোনা গল্পটা বলি। দিলীপ কুমার গঙ্গা যমুনা বানিয়েছিলেন ১৯৬১ সালে। এটিই তাঁর প্রথম প্রযোজিত ছবি। নিজের লেখা কাহিনি, নীতিন বোসের সাথে যৌথভাবে পরিচালনাও করেছিলেন। গঙ্গা যমুনা দুই ভাইয়ের গল্প। দুজনের একজন, গঙ্গা- ছিল ডাকাত। ডাকাত চরিত্রটির ভাষা শুনে তখনকার ভারতীয় সেন্সর বোর্ড বেঁকে বসে। তারা ভেবেছিলেন এই ছবি মুক্তি পেলে হিন্দি ভাষার মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। দিলীপ কুমার তখন মহাতারকা। তাতে কী, বেচারা বনে গেলেন সিনেমা প্রযোজনা করে। কয়েক মাস ধরে শত চেষ্টা সত্ত্বেও কোনও লাভ হচ্ছে না বুঝে যোগাযোগ করেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর কন্যা। সে পরিচয় ছাড়াও নিজের আলাদা একটা অস্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। তার সাথে দেখা ও আলাপ-আলোচনায় কাজ হয়। মুক্তির পর থেকে আজ অবধি ভারতীয় সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় ‘গঙ্গা যমুনা’ বিশেষ হয়ে আছে। হিন্দি ভাষার কোনও ক্ষতি এই চলচ্চিত্রের দ্বারা ঘটেনি। মানুষের মনে শঙ্কা, সন্দেহ থাকে। প্রেম, শোভা, সৌন্দর্যের ঘরবাড়িও থাকে মনে। মানুষকেই বেছে নিতে হয় কোনটা তার জন্য লাভের, কোনটা জরুরি। একজন চলচ্চিত্রকারের নিষ্ঠা, ভালোবাসা, সৃজনকর্মের ওপর অভিভাবকত্ব নাজিল হওয়া বিপন্ন করে, অসহায়বোধ জাগিয়ে দেয়। জাগে বেদনা, হতাশা এবং ক্রোধও। ইদানীং মাঝে মাঝে মনে হয়, আমিই ফারুকী। প্রায়ই মনে হয়, দেখতেও পাই- একটা পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল, কেউ বললো ওকে খাঁচায় ভরে ফেলো। হুকুম জারির পর স্বাধীন পাখিটার যে হাল- চাইলে মানুষ হয়েও তা ষোলোআনা অনুভব করা যায়। আমি অন্য নামের আরেক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ‘শনিবার বিকেল’ নির্মাণের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা ফারুকীর যেমন, যতটা- ততটাই পাই পাই করে অনুভব করতে পারছি। মনে হচ্ছে, মনে হতে থাকে, আমিই ইদানীংকালের মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। খাঁচায় বসে বসে হিসাব করছি, প্রশ্ন তুলছি- সৃজন দ্বারা কখনও কোথাও কি মানুষের অনিষ্ট হয়েছে! উত্তর আসে স্পষ্ট—না। লেখক: নির্মাতা ও অভিনেতা
X