alo
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, মার্চ ৩০, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ চৈত্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দু’জন পুলিশ কর্মকর্তার ‘পাঠাগার’ এবং মানবিক মানুষ গঠনের পাঠ

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১:৩৬ এএম

দু’জন পুলিশ কর্মকর্তার ‘পাঠাগার’ এবং মানবিক মানুষ গঠনের পাঠ
alo

 

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল: সম্প্রতি লাইব্রেরির জন্য বই কেনা সংক্রান্ত একটি খবর মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছে। সরকারের কর্মকর্তাদের বই পড়ায় উৎসাহিত করার জন্য সরকার উপজেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি প্রশাসনিক দপ্তরগুলোয় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য বরাদ্দ করা হয়েছে কম বেশি ৯ কোটি টাকা। প্রশংসনীয় উদ্যোগ সন্দেহ নেই।

ডিজিটালাইজেশনের এই জমানায় আমরা সবাই এখন বই ছেড়ে মোবাইলমুখী। পাতা উল্টে বই পড়ার আর বালিশের নিচে বই গুঁজে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস এখন বিস্মৃত প্রায়। আমি ডিজিটালাইজেশনের ষোল আনা সমর্থক। তারপরও আমি বিশ্বাস করি নতুন বইয়ের পাতায় পাতায় যে নেশা জাগানিয়া ঘ্রাণ, সেই নেশায় না পেলে বই পড়াটা ঠিকঠাক মতো হয়ে ওঠে না। আর বই-ই যদি ঠিকঠাক মতো না পড়লেন, তাহলে চারপাশে এই যে এতকিছু তার জানলেনটাই বা কি? আমরা প্রায়ই আমাদের সমাজের খারাপটুকু দেখি, লিখতে আর বলতেও ভালোবাসি এসব নিয়েই। অথচ আমাদের আশপাশে যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভালো কিছু মানুষ আর ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান সঙ্গে তাদের ভালো কিছু উদ্যোগ, সেসব নিয়ে লিখতে, বলতে, প্রায়ই ভুলে বসি। সেই ভুলে বসা ভুলেই এই লেখাটা লেখা। 

Open photo

সাথে আরেকটু বলি, নিজের লেখা সদ্য প্রকাশিত বইটির পাতা উল্টানো সুঘ্রাণের সুখটুকু বইয়ের লেখকের কাছে যে কি স্বর্গসম, তা শুধু লেখকই বোঝেন। অতএব আমার ভোটটি অবশ্যই ছাপানো বইয়ের পক্ষে এবং সঙ্গত কারণেই আমি সরকারের লাইব্রেরি স্থাপনের এই উদ্যোগটির ঘোর সমর্থকদের একজন। সরকারি এই লাইব্রেরিগুলোর জন্য বই কেনা নিয়ে সাম্প্রতিক সমালোচনার কারণ, লাইব্রেরিগুলোর জন্য বই কেনার তালিকাটিতে স্থান পেয়েছে একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার লেখা ২৯টি বই। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো একজন লেখকের লেখা ২৯টি বই কেনার বিপক্ষে নই, যদি সেগুলো বইয়ের মতো বই হয় আর সেগুলোর বিষয়বস্তু হয় বই কেনার উদ্দেশ্যের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ।

আমি ভদ্রলোকের লেখা একটি বইও পড়িনি। এটি নিঃসন্দেহে আমার ব্যর্থতা। তবে টিভির পর্দায় বইগুলোর বারবার দেখানো প্রচ্ছদ দেখে আমার ধারণা জন্মেছে এই বইগুলো সম্ভবত কবিতা, ছোটগল্প কিংবা উপন্যাসের। আর যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে আমি এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওঠা সমালোচনার ঝড় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে বই কেনার তালিকাটি পুনঃবিবেচনার সিদ্ধান্তের সাথে শতভাগ সহমত। কারণ একজন কবি, ছোটগল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি যে এখনও বাংলা সাহিত্যে স্বীকৃত কোনো ব্যক্তিত্ব নন, এ বিষয়ে আমার সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে তর্ক-বিতর্ক যাই হোক না কেন, সরকারের পাঠাগার স্থাপনের এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে মাথায় করে রাখার মতোই।

Open photo

একটি পাঠাগার সমাজ বদলে দেওয়ায় যে কতটা ভূমিকা রাখে তার মূল্যটা আমি বুঝি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাথে আমার সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতার কারণে। এই সিভিল সোসাইটির সংগঠনটির উদ্যোগে একসময় সারাদেশে গড়ে তোলা হয়েছিল অসংখ্য ‘শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’। আমি যদি ভুল না জেনে থাকি, এই সংখ্যাটি ছিল একশ’র আশপাশে। মুক্তিযুদ্ধকে জানার আর বোঝার পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল এই একেকটি পাঠাগার। নানা ধরনের প্রতিযোগিতাসহ পাঠাগারকেন্দ্রিক নানান বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটা ধারা তৈরি হয়েছিল সে সময়। সঙ্গত কারণেই ২০০১-এ ক্ষমতায় আসার পরপরই জোট সরকারের রোষের শিকারে পরিণত হয় এই পাঠাগারগুলো। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একের পর এক পাঠাগার। এখন ঢাকার মিরপুরে একটি আর রাজশাহী মহানগরে একটি ছাড়া আর কোন শহীদ স্মৃতি পাঠাগার টিকে আছে কি না আমার জানা নেই।

এবার দুটো অন্য রকম পাঠাগারের গল্প। আমি একসময় বিসিএস কর্মকর্তা ছিলাম। অষ্টাদশ বিসিএসএ স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়েছিলাম। পরে যোগ দিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় আমার সাথে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়েছিলেন জয়দেব ভদ্র। এখন তিনি রেল পুলিশের ডিআইজি। ছাত্র জমানাতেই খুলনার পাইকগাছার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘অনির্বান লাইব্রেরি’। সেই লাইব্রেরিটি এখন অনেক বড় হয়েছে। সেখানে লাইব্রেরি ছাড়াও আছে কম্পিউটার ল্যাব, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আর অডিটোরিয়াম। আছে কপোতাক্ষ নামে একটি ইঞ্জিনবোট, যা দিয়ে সুন্দরবনে পর্যটনের ব্যবস্থা করা হয় লাইব্রেরিটির উদ্যোগে। এটি লাইব্রেরিটি স্বয়ংসম্পূর্ণ করার একটি উদ্যোগ। পাইকগাছার মানুষগুলোর চিন্তা আর মননকে খোলনালচে বদলে দিতে ভূমিকা রাখছে এই অনির্বান লাইব্রেরি। এবার সিলেটের বন্যায় অনির্বাণ লাইব্রেরির কপোতাক্ষ যোগ দিয়েছিল সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের বন্যার্তদের ত্রাণে। টনকে টন রিলিফ সামগ্রী পৌঁছে গেছে খুলনার অনির্বান লাইব্রেরির কল্যাণে বৃহত্তর সিলেটের বানভাসি মানুষের ঘরের দুয়ারে।

কৃষ্ণপদ রায়- আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ থেকে বদলি হয়েছেন চট্টগ্রামে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষকর্তা হিসেবে। বৃহত্তর সিলেটে আমাদের দুজনেরই পূর্বপুরুষের আদি নিবাস। সখ্যও বোধকরি সেই সুবাদেই। বলছিলেন দায়িত্ব নেওয়ার পর তার একটি অন্যতম দায়িত্ব হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরের ১৫টি থানা ভবনে স্থাপিত গ্রন্থাগারগুলোকে আরেকটু সমৃদ্ধ করা। শহরের কোতোয়ালি থানায় স্থাপন করা হয়েছিল এ ধরনের গ্রন্থাগারটি আর সর্বশেষটি পতেঙ্গা থানায়। তার পূর্বসূরি সাবেক নগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভির এ গ্রন্থাগারগুলো স্থাপন করেন।

প্রতিটি গ্রন্থাগারে আছে তিনশ থেকে ছয়শটি বই, যার মধ্যে আছে উপন্যাস, কবিতা, গল্প, আত্মজীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, আইন ও ধর্মীয় বই। বই পড়েন পুলিশ সদস্য, পড়েন থানায় আসা দর্শনার্থীরা এমনকি হাজতে আটক হাজতিরাও। সমাজ পরিবর্তনে নিঃসন্দেহে অনন্য ভূমিকা রাখছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এই অসামান্য উদ্যোগটি। আমরা প্রায়ই আমাদের সমাজের খারাপটুকু দেখি, লিখতে আর বলতেও ভালোবাসি এসব নিয়েই। অথচ আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভালো কিছু মানুষ আর ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান আর সঙ্গে তাদের ভালো কিছু উদ্যোগ, সেসব নিয়ে লিখতে, বলতে, প্রায়ই ভুলে বসি আমরা। সেই ভুলে বসা ভুলেই এই লেখাটা লেখা।

সূত্র: আমাদের সময় ডটকম

লেখক: ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

X