alo
ঢাকা, শনিবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২২ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যুবলীগ

প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর, ২০২২, ১০:২০ এএম

সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যুবলীগ
alo


এম. নজরুল ইসলাম: ‘চিরযুবা তুই যে চিরজীবী, জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি। সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা, ঝড়ের মেঘে তোরি তড়িৎ ভরা, বসন্তেরে পরাস আকুল-করা আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা, আয় রে অমর, আয় রে আমার কাঁচা’। (ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-বলাকা)।

মানুষের ধর্ম প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস। জন্তুদের বাস ভূমণ্ডলে, মানুষের বাস সেইখানে যাকে সে বলে তার দেশ। দেশ কেবল ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে। যুগযুগান্তরের প্রবাহিত চিন্তাধারায় প্রীতিধারায় দেশের মন ফলে শস্যে সমৃদ্ধ। বহু লোকের আত্মত্যাগে দেশের গৌরব সমুজ্জ্বল। যে-সব দেশবাসী অতীতকালের তারা বস্তুত বাস করতেন ভবিষ্যতে। তাদের ইচ্ছার গতি কর্মের গতি ছিল আগামীকালের অভিমুখে। তাদের তপস্যার ভবিষ্যৎ আজ বর্তমান হয়েছে আমাদের মধ্যে, কিন্তু আবদ্ধ হয়নি। আবার আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করছি। সেই ভবিষ্যৎকে ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না।

সারা বিশ্বের যুব সমাজের জন্য কবিগুরুর এই কথাগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, সে ইতিহাস তৈরি করেছে তরুণরা। শুধু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর বড় বড় শিল্পী-সাহিত্যিক যুব সমাজের জয়গান গেয়েছেন। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তারুণ্যের বন্দনা করেছেন তার কবিতায় ও প্রবন্ধে। ১৯৩২ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের নাট্যভবনে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, ‘তরুণদের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা, প্রাণের টান। তারুণ্যকে যৌবনকে আমি যেদিন হইতে গান গাহিতে শিখিয়াছি সেই দিন হইতে বারে বারে সালাম করিয়াছি, তাজিম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমস্কার নিবেদন করিয়াছি। গানে কবিতায় আমার সকল শক্তি দিয়া তাহারই জয় ঘোষণা করিয়াছি, স্তব রচনা করিয়াছি।...তরুণ অরুণের মতই যে তারুণ্য তিমিরবিদারী সে যে আলোর দেবতা। রঙের খেলা খেলিতে খেলিতে তাহার উদয়, রঙ ছড়াইতে ছড়াইতে তাহার অস্ত। যৌবন-সূর্য যথায় অস্তমিত দুঃখের তিমির-কুন্তলা নিশীথিনীর সেই তো লীলাভূমি।...আমাদের সম্মুখে কত প্রশ্ন, কত সমস্যা তাহার উত্তর দিতে পারে তরুণ, সমাধান করিতে পারে তরুণ। সে বলিষ্ঠ মন ও বাহু আছে একা তরুণের। সম্মুখে আমাদের পর্বত-প্রমাণ বাধা, নিরাশার মরুভূমি, বিধি-নিষেধের দুস্তর পাথার; এই সব লঙ্ঘন করিয়া অতিক্রম করিয়া যাইবার দুঃসাহসিকতা যাহাদেরথ তাহারা তরুণ। আমাদের লক্ষ্য হইবে এক, কিন্তু পথ হইবে বহুমুখী।

বাংলা সাহিত্যের এই দুই দিকপাল তারুণ্য তথা যুবসমাজের বন্দনা কেন করেছেন, এ প্রশ্নের উত্তর তো এই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসেই রয়ে গেছে। আমরা যদি আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে তরুণ যুব সমাজ সৃষ্ট উদাহরণযোগ্য অনেক ঘটনাই দেখতে পাই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত তারুণ্য তথা যুব সমাজের  মহাবিস্ফোরণ। তারা রাষ্ট্রভাষা কমিটির মূল সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ও পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসে যে ইতিহাস তৈরি করেছে, সেটা আসলে তারুণ্যেরই ইতিহাস। আবার এই সময়ে তারুণ্যের বুকে বন্দুক তাক করার কারণে পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে বিদায়ের হিসাব নিশ্চিত হয়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সুসজ্জিত এবং পৃথিবীর একটা দক্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল এ দেশের লাখ লাখ যুবক তাদের শক্তি ও সাহস নিয়ে। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী মূলত পরাজয়বরণ করেছিল এই যুবশক্তির কাছে।

আর তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরই দেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যথারীতি যুবলীগ প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নির্দেশে এদেশের যুব আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচার, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সব ধর্মের মানুষের স্ব স্ব  ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার তথা জাতীয় চার মূলনীতিকে সামনে রেখে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং যুবসমাজের ন্যায্য অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুবলীগের প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্য থেকে স্বাধীনতা ও প্রগতিকামী যুবক ও যুব মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ে তোলাই যুবলীগের উদ্দেশ্য।  প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের নেতা কর্মীরা দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করে।

১৯৭২ এর  ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠার পর যুবলীগের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল হক মণি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ আহম্মেদ। ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আমির হোসেন আমু। সাধারণ সম্পাদক ফকির আব্দুর রাজ্জাক। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোস্তফা মহসিন মন্টু। সাধারণ সম্পাদক ফুলু সরকার। ১৯৯৪ সালে চতুর্থ কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী ইকবাল হোসেন। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম কংগ্রেস। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম। ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোহাম্মাদ ওমর ফারুক চৌধুরী। সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশীদ।

২০১৯ সালের সপ্তম কংগ্রেসে শেকড়ে ফেরে যুবলীগ। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলে শামস্ পরশ। সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. মাইনুল হোসেন খান নিখিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস্ পরশ। ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইংরেজি সাহিত্যে দ্বিতীয়বার এমএ ডিগ্রি লাভ করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে।

২০১৭ সালে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। এর পর ফিরে আসেন দেশে। যুক্ত হন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকতার সঙ্গে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। তার লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

শুধু যে শেকড়ে ফিরেছে যুবলীগ, তা নয়। এমন একজনের হাতে যুবলীগের পতাকা তুলে দেয়া হয়েছে, যিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি জানেন সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কী করে যুবশক্তিকে এগিয়ে নিতে হয়। এমন স্বপ্নবাজ যুব নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করেই কবিগুরু লিখেছেন,

‘ঐ মহামানব আসে।

দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।

সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,

নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক

এল মহাজন্মের লগ্ন।

আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত

ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।

উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব

নবজীবনের আশ্বাসে।’

অমারাত্রির দুর্গতোরণ ভেঙে উদয়শিখরে নবজীবনের আশ্বাস জাগিয়ে তুলে যুবসমাজকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকা হাতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যুবলীগের। আজ যখন সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন করে আস্ফালন করতে চাইছে। তখন যুবসমাজকে তার সঠিক পথে রেখে যুবলীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করবে, এটাই প্রত্যাশা।

যুবলীগ সময়ের দাবি পূরণে সক্ষমতার পরিচয় নিশ্চয় দেবে।

সূত্র: সময় নিউজ।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি।

X