alo
ঢাকা, রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পোশাক শিল্পে সবুজ বিপ্লব

প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর, ২০২২, ০৭:৩৭ পিএম

পোশাক শিল্পে সবুজ বিপ্লব
alo


অলোক আচার্য: পোশাক শিল্পে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সবুজ কারখানা। সম্প্রতি দেশে আরও দু’টি পোশাক কারখানা সবুজ কারখানার স্বীকৃতি পেয়েছে। এ নিয়ে দেশে সবুজ কারখানার সংখ্যা দাঁড়ালো ১৭৮টি তে। নতুন সবুজ কারখানার ১ টি প্লাটিনাম রেটিংয়ে রেকর্ডসংখ্যক পরিমাণ ১৩টি পোশাক কারখানা সবুজ কারখানা স্বীকৃতি পেয়েছে। এমন এক মুহূর্তে এ অর্জন হচ্ছে যখন পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দা ঘনীভূত হচ্ছে। যার আঁচ লাগছে দেশের পোশাক শিল্পেও।  

জানা যায়, সবুজ পোশাক কারখানায় বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। সারা বিশ্বেই সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব রয়েছে। সংস্কার, জ্বালানি,পানি,বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ কয়েকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে কারখানাগুলোকে সবুজ কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউএসজিবিসি (ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল)। বাংলাদেশের ৫৮টি পোশাক কারখানা প্লাটিনাম রেটিং, ১০৬টি গোল্ড রেটিং এবং ১০টি সিলভার রেটিং পেয়েছে। এছাড়া চারটি কারখানা কোনো রেটিং পায়নি, সনদ পেয়েছে। 

পোশাক শিল্পে কর্মরত কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ তৈরি, সবুজায়ন সবকিছু মিলিয়েই একটি পোশাক কারখানা তৈরি হবে। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে অনুসরণ করবে। সবুজ কারখানার ধারণা এটা। এভাবেই এখন পোশাক কারখানাগুলো গড়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পেছনে অন্যান্য শিল্পের অবদান থাকলেও পোশাক শিল্পের অবদান গত কয়েক দশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে বলা যায়, পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে দেশকে একটি গতিশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে সাহায্য করেছে। এখন সবুজ কারখানার যে শুরু হয়েছে তা পোশাক শিল্পের গতিকে আরও বেগবান করবে। 

পোশাক শিল্প ধাক্কা খায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও আরও কয়েকটি কারণে। তাছাড়া চলমান অর্থনৈতিক মন্দার জেরে উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে যা পোশাক রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে কারখানা বন্ধ হওয়া, কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা আসলে আমাদের জন্য অশনি সংকেত। কারণ আগামী বছরকে বলা হচ্ছে কঠিনতম একটি বছর। বৈশ্বিক অর্থনীতি তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কবলে পরেছে। এই পরিস্থিতি থেকে সহসাই উত্তরণের সম্ভাবনাও নেই। 

এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে না পারলে ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোও আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে পারবে না। ফলে তাদের চাহিদাও কমবে। যার প্রভাব আমাদের পোশাক শিল্পে পরবেই। যদিও গত অক্টোবরেই ইউরোপ-আমেরিকাসহ শীর্ষ বাজারগুলোতে পোশাক রফতানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কোনো দেশে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭ শতাংশ, কোনো দেশে ৩৫ শতাংশ বাবার কোনো দেশে ২০ শতাংশ। নতুন বাজার ভারত ও জাপানেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটা অবশ্যই বড় সাফল্য। এই সাফল্য ধরে রাখতে হবে।

যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার বাজারে কমেছে ৫৮.২৯ শতাংশ এবং চীনের বাজারে কমেছে ১৩.২১ শতাংশ। বাংলাদেশের অন্যতম পোশাক ক্রেতা দেশ যুক্তরাজ্য এখন অতীতের রেকর্ড মাত্রায় মুদ্রাস্ফীতিতে ভুগছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পোশাক কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, ক্রয়াদেশ কম পাওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই ইত্যাদি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই আশার আলো দেখাচ্ছে পোশাক খাতে সবুজায়ন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কারখানা ব্যয়বহুল হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। কারখানার উৎপাদন পরিবেশ সুন্দর হয় যাতে শ্রমিক চমৎকার পরিবেশে কাজ করতে পারে। অথচ সবুজ পরিবেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা খুব বেশি যুগ হয়নি। জানা যায় মাত্র এক দশক আগেও দেশে পরিবেশ বান্ধব সবুজ কারখানার সংখ্যা ছিল মাত্র একটি। 

বাংলাদেশ এখন সবুজ কারখানার যাত্রায় প্রথম অবস্থানে। এটা বিশ্বের ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। এটা পোশাক শিল্পকে প্রসারিত করবে। ফলে আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নিরাপদ হবে কর্মপরিবেশ। বেকারত্বের এই বাজারে পোশাক শিল্পই একটি বড় অংশের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। সুতরাং এখান থেকে কর্মহীন হওয়া অর্থ বেকারত্বের বোঝা ভারী হওয়া। আমাদের অর্থনীতিতে সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশই নারী। যা দেশের নারীদের স্বাবলম্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এই নারীদের একটি বড় অংশই অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত।  

গত অক্টোবরে প্রকাশিত তথ্যে, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগষ্ট) ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য রফতানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে বিশ্বে যত পোশাক রপ্তানি, তার মধ্যে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল বাংলাদেশ। গত বছর সেটি কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।  

পোশাক রপ্তানিতে বড় বাজার অর্থাৎ ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ দখলে রেখেছে। ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে চীন সবচেয়ে বেশি ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোশাক শিল্পের অপ্রচলিত বাজার। যা ইতিমধ্যেই আশার আলো দেখাচ্ছে। আর পোশাক রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে অপ্রচলিত বাজারের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। গেলো জুলাই-আগস্ট মাসে ভারতে পোশাক রফতানি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। আর জাপানে বেড়েছে ১২০ শতাংশ। জাপানে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ২১ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের এবং ভারতে ১৮ কোটি ৮২ লাখ ডলারের পোশাক পণ্য রফতানি হয়েছে। 

আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ১৭ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য। এই দুই দেশে পোশাক রফতানি আমাদের আলো দেখাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে একটি শিল্পকে এগিয়ে নিতে সঠিক পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। পোশাক শিল্পের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বিশেষত সুতার মূল্য কম রাখা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কর্মী ছাঁটাই বন্ধ করা এবং পোশাক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জোর দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা এবং সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। এসব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে সবুজ কারখানা ধারণাটি সর্বাগ্রে গ্রহণযোগ্য। সবদিক ঠিক রাখতে শুরুতে ব্যয় বেশি হলেও কর্মীদের মনোযোগ ও মনোবল বৃদ্ধি কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারণার জন্ম দিবে এবং একসময় তা ঠিক হবে। ক্রেতাদের মনোযোগ থাকবে,আস্থা বাড়বে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। ফলে সবুজ কারখানার এই অগ্রযাত্রা আরও এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি পোশাক কারখানায় উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে পোশাক শিল্প সমৃদ্ধ করতে হবে। 


লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।


 

X