alo
ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ৪, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
মেরিকামায়া সাতকাহন

বিদেশে বায়োলজির পরীক্ষায় ডাহা ফেল, অথচ দেশে নাকি ‘প্রফেসর’ ছিলাম!

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২২, ০১:৪৭ পিএম

বিদেশে বায়োলজির পরীক্ষায় ডাহা ফেল, অথচ দেশে নাকি ‘প্রফেসর’ ছিলাম!
alo

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়: ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আমার আমেরিকার পড়াশোনা শুরু হলো। এবং খুব তাড়াতাড়ি বুঝে গেলাম, দেশে এমএসসি পাশ করেছিলাম বটে, এবং কলেজে পড়াতে গিয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে পণ্ডিতি করতাম বটে, কিন্তু ছিলাম বাঁশবনে শেয়াল রাজা।

হুক্কাহুয়া করতাম ওখানে। যেমন মূর্খ শেয়ালরা করে থাকে।

 

 

সবাই যে ওখানে মূর্খ শেয়াল ছিল, তা নয়। ভারতবর্ষের মতো মহান দেশে সব ছাত্রছাত্রী, সব শিক্ষক শিক্ষিকা মূর্খ শেয়াল -- এমন কথা বলার ধৃষ্টতা যেন আমার কখনো না হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, ডিরোজিও, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সিস্টার নিবেদিতা, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, সুফিয়া কামাল, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী এই দেশেই শিক্ষকতা করে গেছেন। আমাদের সময়ে আমরা দেখেছি অধ্যাপক অরুণ শর্মা, অসীমা চ্যাটার্জী, সুশোভন সরকার, লীলা মজুমদারের মতো শিক্ষকদের। দেখেছি, বা শুনেছি তাঁদের কথা। আমাদের স্কটিশ চার্চ ইস্কুলের শ্যামাদাস মুখার্জী, এ আর রায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্ষৌণীশবাবু, অমলবাবু।

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি’র মিলনার লাইব্রেরি

আরও পড়ুন: মেরিকামায়া সাতকাহন : হলভর্তি অবাঙালি, আমরা গাইলাম ভূপেন হাজারিকার “দোলা হে দোলা...”

আরো অনেক অনেক অনেক মহান শিক্ষক ও শিক্ষিকা।

তাঁরা ছিলেন অন্য এক প্রজাতির।

কিন্তু খুব কম জেনে খুব বেশি বকবক করার প্রবণতা আমার মতো আর পাঁচটা সাধারণ লোকের খুব বেশি থাকে আমাদের দেশে। আমারও তাই ছিল। আমি প্রচুর ভুল জানতাম। খুব কম জানতাম। আমি ভালো করে কোনো কিছু তেমন অধ্যয়ন করিনি। এবং শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য যে প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা, এবং বই মুখস্থের বাইরে গিয়ে বিষয়কে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা -- তা আমাদের দেশে আমাদের সময়ে তেমনভাবে শেখানোই হয়নি। আমরা ব্রিটিশদের কেরানি তৈরির মুখস্থবিদ্যের শিকার।

তা ছাড়া, কলকাতার উচ্চনাসা সবজান্তা ছেলে আমরা। সবকিছুই আমরা মোটামুটি সহজভাবে জীবনে পেয়ে এসেছি -- ওই ট্রাম বাস ট্যাক্সির মতো। একটা গ্রামের ছেলে যখন দেড় মাইল দু মাইল হেঁটে ইস্কুলে যাচ্ছে, সুন্দরবন কলেজে পড়ানোর সময় দেখেছি কী কষ্ট করে তারা আছে, নৌকোয় আসা যাওয়া করছে, কাদায় নদীতে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যায় – তাই সহ্য করছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর – আর কলেজে পড়ার সময়ে ফ্যামিলিকে পিছনে ফেলে আরো তিনজন ছাত্রের সঙ্গে মেস করে আছে – আধপেটা খেয়ে – কেবলমাত্র পড়াশোনাটা শেষ করবে বলে, সেই সময়ে আমরা ক্লাস করছি এক পোয়া, আর সিনেমা থিয়েটার গান ক্রিকেট ফুটবল আড্ডা দিচ্ছি তিন পোয়া।

ততক্ষণে আমাদের ক্লাসের রঞ্জন, চাইনিজ জিনিয়াস মিস্টার ঝাও, আরো কয়েকজন হাজির হয়ে গেছে। হাতের তালু লাল হয়ে গেছে। মুখটাও নিশ্চয়ই হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি না শুধু।


আমেরিকায় পড়তে এসে হাতেনাতে তার প্রমাণ পেলাম। এবং হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেলো। এবারে বাঁচার সংকট। অস্তিত্ব রক্ষার সংকট। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির মতো মাঝারি মাপের স্কুলেও বায়োলজির কিছু ক্লাস করতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থে গায়ে জ্বর এসে গেলো। অসুস্থ হয়ে পড়লাম লেখাপড়ার চাপ না নিতে পেরে। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। তারপরে দু’একটা আনন্দবেদনার গল্পও বলতে হবে আমেরিকায় একেবারে প্রথম জীবনের পড়াশোনা নিয়ে।

 

ডঃ ওয়েবার

হাজার হোক, এই পড়াশোনা করার জন্যেই তো আমেরিকায় আসা, এবং ওই যে “ঘটিকাহিনি”তে লিখেছিলাম, বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া।আমাদের সেল বায়োলজির ক্লাসে পড়াতেন সুটেড-বুটেড ডঃ ওয়েবার। ক্লাসের বাইরে তাঁরা বেশির ভাগই একেবারে সিম্পল মানুষ। আমাদের মতো গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট, অর্থাৎ আমাদের দেশে যাদের বলে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট – মাস্টার্স বা পিএইচডি লেভেলের স্টুডেন্টরা – আমরা হলাম প্রায় তাঁদের সমকক্ষ। মানে, আমরাও তো আন্ডারগ্র্যাজুয়েটদের ক্লাস নিচ্ছি, পড়াচ্ছি, ল্যাবরেটরিতে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নিচ্ছি তাদের, সুতরাং কিছুটা সমকক্ষ তো বটেই। তারপর, ব্যাপার হলো, এদেশে আমেরিকায় যারা মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে আসে, তারা একেবারে ডেডিকেটেড স্টুডেন্ট। কেবলমাত্র রিসার্চ করবার জন্যেই তারা পড়তে এসেছে। কেউ হয়তো দশ বছর একটা হাই স্কুলে পড়িয়ে তারপর আবার পড়াশোনা করার জন্যে ইউনিভার্সিটিতে ফিরে এসেছে। কেউ হয়তো পুলিশে চাকরি করতো, কিন্তু বায়োলজিতে খুব ইন্টারেস্ট ছিল চিরকাল। সে পড়তে এসেছে পঞ্চাশ বছর বয়েসে। এই রকম সব ব্যাপার। অনেক দিন পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স ডিগ্রি করতে গিয়েও সেই একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সুতরাং, পড়াশোনায় অসম্ভব উৎসাহ তো আছেই, তার ওপর বয়েসের দিক থেকেও সিনিয়রিটি আছে। প্রফেসরদের কাছে আমাদের খাতির খুব। আমাদের সাহায্য ছাড়া এমনিতেও তাঁরা ক্লাস টানতে পারবেন না।

কিন্তু ক্লাসের বাইরে অন্যরকম। আই এস ইউ’তে আসার কয়েক সপ্তাহ পরেই ডঃ ওয়েবার আমাদের নতুন ছাত্রছাত্রীদের বললেন, “হে গাইজ, হোয়াট আর ইউ আপ টু দিস উইকেন্ড?” জড়ানো জড়ানো নাসস্ফীত মার্কিনি উচ্চারণ। বুঝে নিলাম সত্তর শতাংশ। বাকিটা ঈশ্বরের ওপর।

আমরা তো কিছুই করছি না। শনিবার আর রবিবার কীভাবে কাটবে, তাই বুঝে উঠতে পারি না। একটাও লোককে চিনি না। নতুন এসেছি, তাই বন্ধুও প্রায় হয়নি বললেই চলে। বাইরে যাবো কী, খরচ করার মতো পয়সাই নেই। একেবারে দারিদ্র্যদশা। দাঁত বের করে থাকলাম ওয়েবারের প্রশ্নের উত্তরে। “সো, লুকস লাইক ইউ ডোন্ট হ্যাভ এ প্ল্যান, ডু ইয়া?” – উত্তরে আমাদের দন্ত আরো একটু বিকশিত হলো। প্ল্যান নেই আমাদের।

“কাম ওভার টু মাই প্লেস। সিক্স-ইশ, হাঃ?” একজনকে জিজ্ঞেস করলাম সেটা কী ব্যাপার। লিসা নাকি ট্রেসি, যে আমাকে পরে কম্পিউটার শিখিয়েছিলো, সে বললো, ছ’টা নাগাদ যেতে বলছে ওর বাড়িতে। ওয়েবার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিলেন। বললেন, হেঁটেই নাকি যাওয়া যাবে। ক্যাম্পাস থেকে দশ বারো মিনিটের বেশি নয়। নতুন বিদেশী ছাত্রদের যে গাড়িটাড়ি নেই, থাকতে পারে না, সে কথা তিনি ভালোই জানেন। প্রতি বছরই একই ব্যাপার দেখে আসছেন।

হে হে, নেমন্তন্ন বলে কথা! তাও আবার আমেরিকান প্রফেসরের বাড়িতে। ইয়ার্কি নয়। শনিবার সন্ধে হতে না হতেই তিনটে শার্ট আর দুটো প্যান্টের মধ্যে ভালোটা পরে হাঁটা দিলাম ঠিকানা পকেটে করে। বিরাট বাড়ি। কিন্তু একটা লোককেও দেখতে পাচ্ছি না। আমেরিকার সাবার্ব। নির্জন, নিস্তব্ধ। ক্যাম্পাস থেকে একটু হেঁটে গেলেই একেবারে যেন নর্থ পোল। এ তো মহা মুশকিল হলো। জিজ্ঞেস করবো কাকে? 
ওহ, ওই যে একটা লোক বাড়ির পাশে লাগানো একটা লোহার মইয়ের ওপরে উঠে দোতলায় রং করছে। লোকটার পরনে রঙের দাগ লাগা নীল জীনসের প্যান্ট, আর আমাদের দেশে আমেরিকার কায়দায় যাকে বলে নিকারবকার – বুকে আর পিঠে স্ট্র্যাপ দেওয়া জীনসেরই জামা। মাথায় একটা আমাদের দেশের ক্রিকেটের মতো টুপি পরা। ওকেই জিজ্ঞেস করা যাক।

 

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পিৎজা পার্টি 

“ইয়ে, মানে এক্সকিউজ মি।” লোকটার রঙের ব্রাশ একটু থামলো। ওপর থেকে সে বললো, “ইয়েয়েস?”

“ইয়ে, মানে, ইজ দিস স্যার, মানে ডক্টর ওয়েবার’স হাউস?”

লোকটা ওপর থেকে বললো, “ইউ আর হিয়ার টু সী হিম?”

মহা ঝামেলা তো! সী হিম! দেখতে আসিনি রে। নেমন্তন্ন করেছে। যত্ত সব ইয়ে।

বললাম, “ইয়েস, সী হিম।”

ওপর থেকে নেমে আসতে আসতে লোকটা বললো, “ওয়েট আপ।”

লোহার মই বেয়ে লোকটা নেমে এলো। তারপর মাথা থেকে টুপিটা খুলে ফেলে একটু হাসলো।

বললো, “ওয়েলকাম টু মাই হাউস।”বলে, হাতটা বাড়িয়ে দিলো সামনের দিকে।

আমি বললাম, “ওহ, মানে, আই ডিড নট ... ইয়ে  ...” ডঃ ওয়েবার বললেন, আরো একটু হেসে, “ওহ দ্যাটস কোয়াইট অলরাইট। কাম অন ইন।”

ততক্ষণে আমাদের ক্লাসের রঞ্জন, চাইনিজ জিনিয়াস মিস্টার ঝাও, আরো কয়েকজন হাজির হয়ে গেছে। হাতের তালু লাল হয়ে গেছে। মুখটাও নিশ্চয়ই হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি না শুধু।

আমরা প্রফেসরের পিছন পিছন বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম।

আরও পড়ুন: মেরিকামায়া সাতকাহন : পিএনপিসি ও বং-ব্যাখ্যান যেন মুখরোচক চানাচুর

হ্যাম স্যান্ডউইচ, বাটি ভর্তি কর্ন সেদ্ধ, ম্যাশড পোটেটো, আর ক্র্যাব আপেলের ডেজার্ট খেয়ে, ভুল ইংরিজিতে অনেক আড্ডা দিয়ে, আর বাকিটা হাহা হিহি করে পুষিয়ে দিয়ে গর্ডনের গাড়ি করে বাড়ি ফিরলাম রাত নটা সাড়ে নটা নাগাদ। কে একটা বোধহয় পৌঁছে দিয়ে গেলো তার গাড়িতে। পরের সোমবার সেল বায়োলজির পরীক্ষা হলো। টেক হোম এক্সাম। অর্থাৎ, প্রশ্নপত্র নিয়ে বাড়ি চলে যাও। বই ঘেঁটে, লাইব্রেরিতে যতক্ষণ খুশি থেকে উত্তর লিখে নিয়ে এসো। আমি তো অবাক! বলে কী রে! এক সপ্তাহ পরে উত্তর জমা দিলাম। তার দু’দিন পরের ক্লাসে আনসার শীট ফেরত। সেল বায়োলজিতে আমি পেয়েছি একশোর মধ্যে পঁয়তাল্লিশ। ষাট নম্বরে পাশ। চীনা ছাত্র মিস্টার ঝাও পেয়েছে পঁচানব্বই। রঞ্জন বলেনি কত পেয়েছে। মুখটা দেখলাম শুকনো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে হনহন করে হেঁটে বাড়ি চলে গেলো। আমি ঘাসের কোয়াডের ওপর বসে থাকলাম। ফেল করেছি। আমি ছিলাম বায়োলজির প্রফেসর দেশের কলেজে।

(চলবে...)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

নিউজনাউ/আরএ/২০২২

 

 


 

X