alo
ঢাকা, শনিবার, জানুয়ারী ২৮, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ যেভাবে হয়

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২২, ০৮:১২ পিএম

ফ্রান্সে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ যেভাবে হয়
alo

নিউজনাউ ডেস্কঃ অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে হতাশা প্রকাশ করছেন ফরাসি মহিলা স্ট্রিমাররা। তাদের অভিযোগ, অশ্লীল ছবি, হুমকি এবং অপমানের আকারে বছররের পর বছর ধরে তারা এসব হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 

এমনই একজন ভুক্তভোগী ভিডিওগ্রাফার মাঘলা। ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট- টুইচে তার ভিডিও গেমের স্ট্রিমিং করে থাকেন তিনি। সম্প্রতি একটা টুইটারে সিরিজ পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, কীভাবে পর্ন কন্টেন্ট বানাতে তার ছবি এবং স্ক্রিনশট ব্যবহার করা হচ্ছে। 

ফ্রান্সে যে কোন ধরনের যৌন হয়রানি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনলাইনে, পাবলিক স্পেসে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই হোক তার শাস্তি হিসেবে তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং ৪৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রয়েছে। ১৯৯২ সালের ২ নভেম্বর থেকে ফরাসি আইনে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা প্রদান করা হলেও, ৩০ বছর পরেও যুগোপযোগী করে তৈরি করার নিমিত্তে নিয়মিত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই আইন। 

নারীবাদী ইতিহাসবিদ এবং ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ফেমিনিস্ট স্টাডিজ এর সহ-সভাপতি ফ্রাঙ্কোইস পিক জানান, 1980 এবং 1990 এর দশকে ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স অ্যাট উইমেন অ্যাট ওয়ার্ক (এভিএফটি) এর কর্মীরা রাজনৈতিক এজেন্ডায় যৌন হয়রানিকে রেখেছিল। তারা ভিকটিমদের তাদের প্রথম অভিযোগ দায়ের করতে সাহায্য করেছিল।

১৯৯২ সালের ফরাসি আইন অনুযায়ী যৌন হয়রানি বলতে বুঝানো হয়েছে, যৌন প্রকৃতির সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে আদেশ, হুমকি বা প্রতিবন্ধকতা ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিকে হয়রানি করার ঘটনা।

এ আইন শুধু কর্মক্ষেত্রে উর্ধ্বতনদের দ্বারা সংঘটিত হয়রানির সাথে সম্পর্কিত, বলে দাবি করেছেন পিক। 

তিনি বলেন, সেই সময়ে ফরাসি নারীবাদীরা মার্কিন মডেল অনুসরণ করতে চাননি। সে সময় মার্কিন আদর্শ মতে, একজন অধ্যাপকের অফিসে কোনো মহিলা একা থাকার অনুমতি ছিল না। তবে ফ্রান্সে লক্ষ্য ছিল এমন লোকদের শাস্তি দেওয়া যারা কর্মক্ষেত্রে নিজেরা উর্ধ্বতন পদে থাকার অনৈতিক সুবিধা নিয়ে যৌন হয়রানি করেছে।

পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে, আইনটিতে ‘গুরুতর চাপ’ শব্দ দুটি যুক্ত করা হয়। 2002 সালে, সংজ্ঞাটি ‘যৌন প্রকৃতির সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে অন্য ব্যক্তিকে হয়রানি করা’ রূপে পরিমার্জন করা হয়। এখন যে কোন ধরনের যৌন হয়রানি, তা কর্মস্থলে সহকর্মী, রাস্তায় অপরিচিত বা অনলাইনের লোকজনের দ্বারা সংঘটিত হোক না কেন, অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যৌন হয়রানির সংজ্ঞাকে নৈতিক হয়রানির সাথে সামঞ্জস্য রাখা। 

ফরাসী জাতির জন্য সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা ঘটে, ২০১২ সালে। দেশটির সাংবিধানিক কাউন্সিল যৌন হয়রানির উপর দণ্ডবিধির নিবন্ধটি বাতিল করে। তাদের মনে হয়েছিলো, সংজ্ঞাটি খুব ফাঁকা এবং তাই অসাংবিধানিক। ফলে দেশটির যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিরা কয়েক মাসের জন্য আইনি শূন্যতায় পড়ে।

শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং নৈতিক ও যৌন হয়রানি বিষয়ক সংস্থা এইচ ই আর এর তদন্ত কর্মকর্তা নাথালি লেরয় বলেন, সেই সময়ে ফৌজদারি আইন নিয়ে আমাদের একটি বড় সমস্যা ছিল। এমনকি যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তিও এ সুযোগে খালাস পেয়ে যায়, যা ভুক্তভোগীদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। 

একই বছরে একটি জরুরী অধিবেশনে ভোতের মাধ্যমে নতুন আইন জারি করা হয়। সে আইনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির বিষয়েও সংজ্ঞায়ন করা হয় এবং সম্পর্কিত শাস্তিগুলোকেও জোরদার করা হয়। 

২০১৮ সালে যৌন হয়রানির সংজ্ঞায় নতুন করে যুক্ত করা হয় অপরাধের বিষয়টি। সেখানে ‘বারবার যৌন বা যৌনতাবাদী মন্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে কারো উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার ঘটনা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে এটিকে।
লেরয় জানান, যদিও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের ঘটনা চিহ্নিত করা কঠিন, তবুও যে এমন কাজটি করছে তার প্রকৃতি, কত ঘন ঘন এমন ঘটনা ঘটছে, অপরাধীর উদ্দেশ্য এবং ভুক্তভোগীর উপর এর প্রভাব এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে বর্তমান সংজ্ঞায় সবচেয়ে ভালো দিক হলো, যৌন হয়রানি যে সরাসরি যৌন বিষয়ক হতে হবে এমন নয়। বরং এখানে আচরণের বিষয়টিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

ফ্রান্সে শ্রম আইন এখন ফৌজদারি অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট। সাড়ে চার মিলিয়ন ফরাসি কর্মচারীর উপর ২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) দ্বারা পরিচালিত একটি সমীক্ষাইয় দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ মহিলা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুরুষদের জন্য, চিত্রটি ছিল ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ নারী অভিযোগ করেছেন এবং ১ শতাংশ পুরুষ।

লেরয় আরো বলেন, যৌন হয়রানি কমানোর ক্ষেত্রে প্রতিরোধই মূল চাবিকাঠি। শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়োগকর্তাকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, বন্ধ এবং শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে শিল্প ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কাজের বাইরে তাহলে যৌন হয়রানি কীভাবে রোধ করা যায়?

নারী স্ট্রিমারদের তোপের মুখে পরে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে তাদের পলিসি কঠোর করে টুইচ। তখনো অবশ্য প্ল্যাটফর্মটিতে যৌন হয়রানি নিষিদ্ধ থাকলেও, তার কোনো সংজ্ঞা ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে তারাও এটির নতুন সংজ্ঞায়ন করেছে এভাবে, শারীরিক চেহারা বা যৌনতা সম্পর্কে বারবার, অশ্লীল বা স্পষ্ট মন্তব্য করা, অবাঞ্ছিত নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো ইত্যাদি। 

আর পাবলিক স্পেসে? 

পিক-এর মতে, ২০১৭ সালে #MeToo আন্দোলন পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির বিষয়ে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা প্রায়ই প্রমাণের অভাবে বা পরিণতির ভয়ে অভিযোগ দায়ের করে না।

তিনি বলেন, আমাদের সময়ে সবসময় রাষ্ট্রের কাছে অভিযোগ করতে চাইলেও আমরা পারিনি। আজ আমাদের সাহায্য করার জন্য অনেক আইনি সরঞ্জাম উপলব্ধ রয়েছে।

নিউজনাউ/একে/২০২২

X