alo
ঢাকা, রবিবার, ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৩ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঐশ্বর্য ছড়িয়ে মৃত্যুর মুখে জীবনের জয়গান গাইলেন সারাহ

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারী, ২০২৩, ১২:৪১ এএম

ঐশ্বর্য ছড়িয়ে মৃত্যুর মুখে জীবনের জয়গান গাইলেন সারাহ
alo

 

নিউজনাউ ডেস্ক: নশ্বর জীবন ত্যাগ করে অবিনশ্বর হয়ে রইলেন সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য। জীবনের ২০টি বসন্ত পার করা এই 'বীর তরুণী'র কীর্তি কতটা ঐশ্বর্য মন্ডিত তা বাংলাদেশ জেনেছে। ২০ বছর বয়সী সারাহ রোগশয্যায় থেকে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্যকে দান করার ইচ্ছা মাকে জানিয়েছিলেন। তার দুটি কিডনি ও দুটি কর্নিয়া চার ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করেছেন দেশের চিকিৎসকেরা।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘মৃত ঘোষিত ব্যক্তির’ অঙ্গ প্রতিস্থাপন করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিডনি ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকেরা।

সারাহ মাত্র ১০ মাস বয়সে আক্রান্ত হন দুরারোগ্য টিউবেরাস স্ক্লেরোসিস রোগে (বিরল জন্মগত রোগ, যেখানে দেহের বিভিন্ন স্থানে টিউমার হয় যা ক্যান্সার না)। এরপর প্রায় ১৯ বছর লড়াই করে গেছেন এ রোগ নিয়ে। অবশেষে সে লড়াইয়ের অবসান ঘটল গতকাল বুধবার। মৃত্যুর পর শুধু কিডনি নয়, দেহের সবকিছুই দান করে গেছেন সারাহ। তবে তার কিডনি ও কর্নিয়া নেওয়া হয়েছে। সারাহই দেশে প্রথম মরণোত্তর কিডনি দান করলেন।

সারাহর কর্নিয়া দুটিও ইতিমধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। একটি কর্নিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজশ্রী দাশ সুজন নামের ২৩-২৫ বছর বয়সি যুবকের চোখে, অপর কর্নিয়াটি কমিউনিটি অপথালমোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শীষ রহমান ফেরদৌস আক্তার নামের ৫৬ বছর বয়সি এক নারীরে চোখে প্রতিস্থাপন করেন।

শৈশব থেকেই দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে বড় হয়েছেন সারাহ। জীবন সহজ ছিল না। সমবয়সি অনেক শিশু তার মুখের টিউমার দেখে ভয় পেত, তার পাশে বসতে চাইত না। কিন্তু সেই  বন্ধুর পথ পেরিয়েই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন। ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, পছন্দের বিষয় ফাইন আর্টসে। টিউমার নিয়ে লড়াই করে গেছেন এই বিশ বছর। 

মেয়ের লড়াই নিয়ে সারাহর মা, শিক্ষিকা শবনম সুলতানা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'খুব কষ্ট পেত ও। ছোটবেলায় ওর মুখের এই টিউমারগুলো দেখে সবাই ভয় পেত। কোনো কোনো বাচ্চারা ওর পাশে বসতে চাইত না। [সারাহ] অনেক কষ্ট করেছে, অনেক কেঁদেছে।'

সারাহ জানতেন, তিনি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই মাকে বলে গিয়েছিলেন, 'প্রয়োজন হলে আমার ব্রেনও তুমি দান করে দিও আমার মৃত্যুর পর। সবকিছুই তুমি গবেষণার জন্য দিয়ে দিতে পারো, মা।'

তিন দিন আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়ে সারাহকে। বুধবার সন্ধ্যায় তাকে 'ব্রেন ডেড' ঘোষণা করা হয়। এরপর মেয়ের ইচ্ছামতোই মা শবনমও সারাহর অঙ্গ দানে সম্মতি দেন। বাংলাদেশে যা বিরল ঘটনা। দেশে সাধারণত 'ব্রেন ডেড' রোগীর আত্মীয়দের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অনিচ্ছার কারণে এতদিন মরণোত্তর কিডনি দান সেভাবে আলোর মুখ দেখছিল না। চিকিৎসকরা আশা করছেন, সারাহর দেখানো পথে মরণোত্তর কিডনি দানে উদ্বুদ্ধ হবে মানুষ।

এই কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে। এতে ক্লিনিক্যালি ডেড বা ব্রেইন ডেড রোগীর কিডনি নিয়ে অন্য রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে একটি দল বিএসএমএমইউর আইসিইউতে মারা যাওয়া ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর দুটি কিডনি অপসারণ করেন। বুধবার মাঝরাতেই কিডনি দুটি অন্য দুজনের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়।

একটি কিডনি দেওয়া হয়েছে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন ৩৪ বছর বয়সী এক নারীকে। অপর কিডনি পেয়েছেন জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৯ বছর বয়সী এক নারীর শরীরে।

ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, রোগীর মা সম্মতি দেওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। কিডনি প্রতিস্থাপন করতে ইচ্ছুক পাঁচজন রোগীকে বাছাই করা হয়। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় সারা ইসলামকে মৃত ঘোষণা করা হয়। রাত ৯টায় দুজনের শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তারা।

তিনি বলেন, 'আমরা রাত সাড়ে ১০টার সময় সারার শরীরে থেকে কিডনি অপসারণ শুরু করি। জটিল অপারেশন ছিল, দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় কিডনি বের করে আনি।'

কিডনি বের করে আনার পর তা বিশেষ উপায়ে পরিষ্কার করতে আরও ত্রিশ মিনিটের মত লাগে। কিডনি পরিষ্কার করে একটি রাখা হয় বিএসএমএমইউতে, আরেকটি পাঠিয়ে দেওয়া হয় কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে।

'রাত ১টার দিকে আমরা বিএসএমইউর রোগীর শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু করি। এটি শেষ হয় ভোর সোয়া ৪টায়। কিডনি ফাউন্ডেশনের অপারেশন শেষ হয় ভোর ৫টায়।'

অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন হওয়ার পর দুজন রোগীই ভালো আছেন।

'বিএসএমএমইউর রোগী এরইমধ্যে প্রস্রাব শুরু হয়েছে। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের পর প্রস্রাব শুরু হতে একটু দেরি হয়, কিন্তু এটা ভালো হয়েছে।'

নিউজনাউ/পিপিএন/২০২৩

X